আর্থিক খাতে পদত্যাগের ঝড়: নেতৃত্ব বদলের মোড়ে ব্যাংক-বীমা ও পুঁজিবাজার প্রকাশিত: ৭:৪১ অপরাহ্ণ, মার্চ ২, ২০২৬ নূরনবী সোহেল, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ দেশের আর্থিক খাতে হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে নেতৃত্ব পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা। একদিনেই ব্যাংক, বীমা ও পুঁজিবাজারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান পরিবর্তন বা পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক, জীবন বীমা কর্পোরেশন, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), সাধারণ বীমা করপোরেশন এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সোমবার সকালে সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। তিনি এর আগে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) এবং অর্থসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২৮ আগস্ট তাকে সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে বিভিন্ন পক্ষের চাপ বাড়ছিল। বিশেষ করে শাখা ও প্রধান কার্যালয়ে পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়ন ও বদলি নিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। যদিও তিনি প্রকাশ্যে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেননি, তবুও কর্মকর্তাদের ধারণা—ক্রমবর্ধমান চাপই তার সরে দাঁড়ানোর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। এদিকে আইডিআরএর চেয়ারম্যান এম আসলাম আলমও আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে এক সভায় তিনি ব্যক্তিগত কারণে দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছিলেন তিনি। এর আগে তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সময় তাকে ওএসডি করা হয়। পরে তিনি বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (পিএটিসি) রেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার আইডিআরএ অধ্যায়ে বীমা খাতে কাঠামোগত সংস্কার ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ছিল, তবে শিল্পের ভেতরে নানা অসন্তোষ ও অভিযোগও আলোচিত হয়েছে। একই দিনে সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারীও পদত্যাগ করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। অন্যদিকে বিএসইসি চেয়ারম্যান রাশেদ মাকছুদের পরিবর্তে সাবেক সিনিয়র সচিব ফরিদুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নতুন নেতৃত্ব কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আইডিআরএ ঘিরে অভিযোগ ও সংস্কারের প্রত্যাশা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিতর্কের বাইরে থাকতে পারেনি—এমন অভিযোগ শিল্প সংশ্লিষ্ট অনেকের। বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ, লাইসেন্স প্রদান, তদারকি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। সামনে কী? সংস্কারের সুযোগ নাকি পুরোনো ধারার পুনরাবৃত্তি একদিনে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব পরিবর্তন নিছক প্রশাসনিক রদবদল নয়—এটি দেশের আর্থিক খাতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ব্যাংক খাতে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ, বীমা খাতে গ্রাহক আস্থার ঘাটতি এবং পুঁজিবাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা—সব মিলিয়ে এখন প্রয়োজন দৃঢ়, দক্ষ ও নিরপেক্ষ নেতৃত্ব। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রভাবমুক্ত পরিবেশে কাজ করা এবং নীতিনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। নিয়োগ, বদলি, লাইসেন্স প্রদান কিংবা তদারকির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে আগের বিতর্কগুলো আবারও ফিরে আসতে পারে। বিশেষ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সুশাসন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত নীতিনির্ধারণ—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে আর্থিক খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। অন্যথায় নেতৃত্ব বদল কেবল কাগুজে রদবদল হিসেবেই থেকে যাবে। এখন পুরো আর্থিক খাতের দৃষ্টি নতুন নেতৃত্বের দিকে—তারা কি অতীতের অভিযোগ ও বিতর্কের পুনরাবৃত্তি করবেন, নাকি সত্যিকার অর্থেই ব্যাংক, বীমা ও পুঁজিবাজারকে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও আস্থাভিত্তিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবেন—সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামীর কার্যক্রম। SHARES অর্থনীতি বিষয়: