এক যাত্রায় তিন প্রকৃতির রূপ: পাহাড়-ঝর্ণা-সাগর জয়

প্রকাশিত: ৭:০৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৫, ২০২৬

ইয়ামিন হাসান নাদিম: বহু ব্যস্ততায় দিশেহারা শরীর ও মস্তিষ্ক। শত ব্যস্ততার মধ্যে একটু রিফ্রেশমেন্ট দরকার। দরকার বুকভর্তি নিঃশ্বাস নেওয়ার। তাই প্রকৃতির গহীনে ডুবে মনকে উৎফুল্ল করতে ৬ জন পরিকল্পনা করি ভ্রমণের। যেতে চাই সাগর, পাহাড় আর ঝরনার রাজ্য সীতাকুণ্ড। সেই খাঁজেই আমরা ৬ বন্ধু – ইয়ামিন, আহাদ, আলিফ, বিল্লাল, আরিফ ও টুটুল – বেরিয়ে পড়লাম সাগর, পাহাড় আর ঝর্ণার রাজ্য সীতাকুণ্ডের পথে।

ঢাকা থেকে রাত ১১:৪৫ এর মেইল ট্রেন। লোকাল ট্রেন স্টেশনে থেমে থেমে ভালোবাসা কুড়োতে কুড়োতে সকাল ৭:৫০ এ আমাদের নামিয়ে দিল সীতাকুণ্ডে। ট্রেন থেকে নেমে রিকশায় চেপে সোজা চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে। সেখানেই সকালের নাস্তা সেরে নিলাম।
চন্দ্রনাথের পথে
পাহাড়ে ওঠার আগে ৫০ টাকায় বাঁশের লাঠি নিলাম, ৩০ টাকা ফেরতযোগ্য। সাথে নিলাম কিছু শুকনো খাবার আর পানি, কারণ উপরে পানির দাম আকাশছোঁয়া। কিন্তু কিছুদূর উঠতেই আমাদের পানি শেষ! ভাগ্যিস পথে ভ্রাম্যমাণ দোকান ছিল।

সকালে বৃষ্টি হওয়ায় পাহাড়ের কাদা-মাটির পথ ছিল পিচ্ছিল। আরিফ ২ থেকে ৩ বার পিছলে পড়ে গেল, একবার তো একেবারে খালি জায়গায়। আরিফের কাণ্ড দেখে হাসতে হাসতে আমরা ক্লান্তি ভুলে গেলাম। আমরা কিছুদূর পর পর রেস্ট নিয়ে, দোকান থেকে লেবুর শরবত আর কলা খেয়ে আবার ওঠা শুরু করি। যত উপরে উঠি, ততই যেন প্রকৃতি তার রূপ বদলায়।

সামনে উঁচু-নিচু নির্জন পাহাড়, পাখির কলরব আর দূরে সমুদ্রের হাতছানি। পাহাড় কেটে সিঁড়ি বানানো পিচ্ছিল রাস্তা বেয়ে ওপরে ওঠা কষ্টের। নিচে তাকালে ভয়ে কলিজা শুকিয়ে যায়। ওপরে তাকালে ভয়ে নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, ‘আমি আর ওপরে উঠতে পারবো না’। পাহাড়ের মাঝামাঝি পথ এতটাই ভয়ংকর নির্জন যে, কোনো শব্দ নেই। মনে হবে পৃথিবীও স্তব্ধ হয়ে আছে ভয়ে। নিজের হৃৎপিণ্ডের ধকধকানি শুনতে পাওয়া যায়। বামপাশে সুবিন্যস্ত খাড়া পাহাড়; ডানপাশে তাকালেই পাহাড়ের পাদদেশ। পাহাড় মানেই কঠিন বাস্তবতা। না পারা যায় ছেড়ে আসতে, না পারা যায় ওপরে উঠতে। উনিশ-বিশ হলেই মৃত্যু অনিবার্য। সিঁড়ির আদলে পাহাড় কাটা আর প্রতিটা ধাপেই যেন মৃত্যু লেখা।

অবশেষে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে চন্দ্রনাথের চূড়ায় পৌঁছে গেলাম। সত্যি এক অফুরন্ত সৌন্দর্যের সম্ভার। সব ক্লান্তি এক নিমিষেই উবে গেলো। চোখ ধাঁধানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে। সবাই স্মৃতি ধরে রাখতে ফটোসেশন করলাম। যারা চন্দ্রনাথ পাহাড়ে গেছেন; তারা জানেন এটার দুটি চূড়া। আমরা উত্তর পাশে উঠেছি। এবার দক্ষিণ পাশের চূড়ায় ওঠার পালা। অনেক কষ্ট করে দক্ষিণ পাশের চূড়ায় পৌঁছলাম। যত ক্লান্তি, পায়ের ব্যথা আর মাংসপেশীর টান সবকিছু তলিয়ে যায় মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য দেখে।

মনের মধ্যে পাহাড়ে ওঠার আনন্দ নিয়ে পাহাড় থেকে নামতে শুরু করলাম, নামার সময় ও কয়েক জায়গায় বসে বিশ্রাম নিলাম, তারপর আস্তে আস্তে পাহাড় থেকে নেমে পড়লাম, পাহাড় থেকে নেমে দোকান থেকে আমাদের রেখে যাওয়া ব্যাগগুলো নিলাম এখন যাত্রা ঝর্ণার উদ্দেশ্যে।

পরিকল্পনা বদলে সুপ্তধারার শীতলতা
আমাদের পরিকল্পনা ছিল সহস্রধারা ঝর্ণা, কিন্তু পাহাড় থেকে নেমে সিদ্ধান্ত বদলে গেল। চলে গেলাম সুপ্তধারা ঝর্ণায়। সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক, যা ৮০০ হেক্টর জায়গা জুড়ে বিরল প্রজাতির গাছপালা আর জীববৈচিত্র্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার ভেতর দিয়েই ঝর্ণার পথ। এখানে কিছু জায়গায় যেতে বোর্ডের সাহায্য নিতে হয়। ঝিরিপথের শব্দ শুনতে শুনতে যখন ঝর্ণার সামনে পৌঁছলাম, বরফ-শীতল পানিতে আমাদের সব গ্লানি মুছে গেল। ঝর্ণায় গোসল সেরে আমরা রওনা দিলাম সীতাকুণ্ড বাজারের দিকে। ততক্ষণে ঘড়িতে বিকেল ৫টা। দুপুরের খাওয়া হয়নি। বাজারে এসে হোটেল নিয়ে ফ্রেশ হয়ে খেতে গেলাম। খেয়ে রুমে এসে সবাই একটু ঘুমালাম। ঘুম ভাঙল রাত ১০টায়। আবার খাওয়া-দাওয়া করে সাথে চিপস, চানাচুর নিয়ে রুমে ফিরলাম। তারপর শুরু হলো আসল আড্ডা – কার্ড খেলা, গান, নাচানাচি। চলল রাত ৪টা পর্যন্ত। তারপর সবাই ঘুম।

অলংকার থেকে পতেঙ্গা, সূর্যাস্তের অপরূপ মায়া
সকাল ৮টায় ঘুম থেকে উঠে সবাইকে ডেকে তুললাম। ফ্রেশ হতে হতে বেজে গেল ১০টা। হোটেল চেক আউট করে বাস কাউন্টারে গেলাম। সীতাকুণ্ড থেকে অলংকার ৩০ মিনিটের পথ, কিন্তু লোকাল বাস হওয়ায় সময় বেশি লাগল। অলংকার থেকে সিএনজি নিয়ে রওনা হলাম পতেঙ্গার উদ্দেশ্যে। সিএনজিতে বসে গল্প করতে করতে চলে এলাম পতেঙ্গা।

পতেঙ্গা একটা হোটেল নিলাম। লাঞ্চ সেরে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে বিকেলে চলে গেলাম সাগর পাড়ে। অনেককে সাগরে নামতে দেখলাম, আমাদের প্ল্যান না থাকায় কেউ নামিনি। কিন্তু বিকেলের সূর্য যখন সাগরের পানিতে পড়ছিল, সে দৃশ্য ছিল অপরূপ। সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে আবার রাতে বের হলাম। তখন সাগরের পানি অনেক নিচে নেমে গেছে। নিরিবিলি সৈকতে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।

হোটেলের পাশেই বার্মিজ মার্কেট। সেখান থেকে বাসার জন্য আচার আর কসমেটিক কিনলাম। ডিনার সেরে রুমে ফিরে আবার সেই আড্ডা, কার্ড আর গান।

তৃতীয় দিন সকাল ৭টায় উঠে সবাই রেডি হতে হতে সাড়ে ৮টা। পতেঙ্গা থেকে সরাসরি বাস নেই, তাই সিএনজি নিয়ে অলংকার, সেখান থেকে স্লিপার বাসে চেপে ঢাকার পথে। বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে আমরা ঢাকায়। পকেট ফাঁকা, কিন্তু মন ভর্তি পাহাড়, ঝর্ণা আর সাগরের গল্প নিয়ে।