পদ্মা ব্যাংক অবসায়নের পথে প্রকাশিত: ৩:৪৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০২৬ নিজস্ব প্রতিনিধি : দীর্ঘদিনের তারল্যসংকট, বিপুল খেলাপি ঋণ ও পুঞ্জীভূত লোকসানে নাজুক হয়ে পড়া পদ্মা ব্যাংক অবসায়নের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটির পরিস্থিতি উন্নয়নে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংকট কাটেনি। ফলে ব্যাংকটি গুটিয়ে ফেলা ছাড়া কার্যকর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পদ্মা ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পদ্মা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক হয়। বৈঠকে ব্যাংকটির আর্থিক ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। তবে ব্যাংকটিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার কোনো বাস্তবসম্মত পথ পাওয়া যায়নি। এরপর অবসায়নের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চলতি মাসেই প্রস্তাবটি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন হলে ব্যাংকিং রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদ্মা ব্যাংক বন্ধের কার্যক্রম শুরু হবে। এটি কার্যকর হলে দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো ব্যাংক অবসায়নের ঘটনা ঘটবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, পদ্মা ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় এর দায়িত্ব বা নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইবে না। ব্যাংকটির মন্দ ঋণ, পুঞ্জীভূত লোকসান ও মূলধন ঘাটতি এত বেশি যে সাধারণ প্রক্রিয়ায় তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন। ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখা কিংবা অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করাও অত্যন্ত কঠিন। সব মিলিয়ে অবসায়ন ছাড়া বিকল্প নেই। বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারা, বিপুল খেলাপি ঋণ ও তারল্যসংকটের কারণে পদ্মা ব্যাংকের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনা হলেও তারল্য ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। সংকট থেকে উত্তরণের কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি। ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চাওয়া হয়েছিল, যা বাংলাদেশ ব্যাংক প্রত্যাখ্যান করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পদ্মা ব্যাংকের দায় আর কত দিন বহন করা হবে, সেই প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান অবস্থায় ব্যাংকটি রাখা হবে না। কোনো ব্যাংকই পদ্মা ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হতে আগ্রহী নয়। এর আগে এক্সিম ও সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে পদ্মা ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। খেলাপি ঋণ ৯০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে পদ্মা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশ। আগের বছরের জুনে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ হাজার ১৩১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ঋণ পুনঃতফসিল ও এক্সিট কর্মসূচির আওতায় কিছু টাকা আদায় হওয়ায় খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমেছে। তবে ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতির বড় কোনো উন্নতি হয়নি। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে পদ্মা ব্যাংকের সম্পদ ছিল প্রায় ৬ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। এর বড় একটি অংশ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার অর্থ। ৪৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকটিতে আটকে আছে। এর মধ্যে সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), জীবন বীমা করপোরেশন, সাধারণ বীমা করপোরেশন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, তিতাস গ্যাস, বিটিআরসি, মোংলা বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দর রয়েছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড ও সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টের প্রায় ৭৬০ কোটি টাকা পদ্মা ব্যাংকে জমা রয়েছে। এসব অর্থও বছরের পর বছর ফেরত দিতে পারছে না ব্যাংকটি। যেভাবে সংকটে পড়ল ২০১৩ সালে ফার্মারস ব্যাংক নামে কার্যক্রম শুরু করে পদ্মা ব্যাংক। চার বছরের মধ্যেই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ব্যাংকটি সংকটে পড়ে। পরে ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, নাম পরিবর্তন, মূলধন জোগানসহ বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা দেয়। ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ফার্মারস ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে পদ্মা ব্যাংক করা হয়। একই বছর রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবি মিলে ব্যাংকটিতে ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন জোগান দেয়। তবে সেই অর্থও ফেরত আসেনি। ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান ও সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান বলেন, ‘ব্যাংকটির তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমানত ও মূলধন শেষ হয়ে গেছে। সঞ্চিত লোকসান এখন ব্যাংকটির সম্পদ ও দায়ের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ঋণ আদায় ছাড়া ব্যাংকের কর্মকর্তাদের তেমন কাজ নেই। ব্যয় কমানোর জন্য ব্যবস্থাপনাকে আগেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তেমন অগ্রগতি হয়নি। সরকারি নির্দেশে পদ্মা ব্যাংকে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। এখন ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারকেই নিতে হবে। বর্তমানে পদ্মা ব্যাংকের ৬০টি শাখা, ১৪টি উপশাখা ও ছয়টি এজেন্ট আউটলেট রয়েছে। ব্যাংকটিতে কর্মরত আছেন প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ব্যাংকটি সংকটে পড়ার শুরুর দিকেই অবসায়ন অথবা অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি কম হতো। এখন অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে ব্যাংকটির সঞ্চিত লোকসান ও মূলধন ঘাটতির দায় সরকারকেই বহন করতে হতে পারে। News PhotoCard SHARES অর্থনীতি বিষয়: