নিজস্ব প্রতিবেদক : বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সিদ্ধান্তহীনতায় বীমা কোম্পানিগুলির লাইসেন্স নবায়ন হচ্ছে না। এ অবস্থায় বীমা কোম্পানিগুলো নবায়ন ছাড়াই বীমা ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছে।
প্রচলিত বীমা আইনে প্রতি বছর নভেম্বর মাসের মধ্যে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করতে হয়। বীমা কোম্পানিগুলো সময়মতো নিয়ম মেনেই নবায়নের জন্য আবেদন করে। কিন্তু বাধ সাজে কর্তৃপক্ষের নবায়ন ফি বৃদ্ধির উদ্যোগ। এর ফলে বীমা কর্তৃপক্ষ লাইসেন্স নবায়ন না করে আটকিয়ে রাখে। অবশেষে নবায়ন ফি বৃদ্ধি করে ৪ ফেব্রুয়ারি নতুন গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরপর বর্ধিত হারে ফি জমা দিতে বলা হয় বীমা কোম্পানিগুলোকে। এতে অধিকাংশ বীমা কোম্পানি আপত্তি জানায়। মাত্র ১৩টি বীমা কোম্পানি বর্ধিত ফি জমা দিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করিয়ে নেয়। বেসরকারি খাতের ৮০টি বীমা কোম্পানির মধ্যে ৬৭টি বীমা কোম্পানির লাইসেন্স এখনো নবায়ন হয়নি। অথচ এ সকল বীমা কোম্পানি যথাসময়েই ফি জমা দিয়ে নবায়নের জন্য আবেদন করে বীমা কর্তৃপক্ষের কাছে। তাদের বক্তব্য আমরা কেন দুইবার ফি জমা দিব। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বীমা কোম্পানিগুলোকে বার বার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও এ সকল বীমা কোম্পানি বর্ধিত হারে ফি জমা দিচ্ছে না। বীমা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে বীমা কোম্পানির তোপের মুখে পড়েছে। বিষয়টি সুরাহা করতে এখন তারা মন্ত্রনালয়ের নিদের্শনা চেয়েছে। মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনা পাবার পর কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিবে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী কোম্পানিগুলো ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ২০২৬ সালের লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন ও ফি জমা দেয়। তবে ২০২৬ সালে বিধিমালা সংশোধন করে নবায়ন ফি বাড়ানো হলে আইডিআরএ নতুন হারে অতিরিক্ত ফি দাবি করে। এতে আপত্তি জানিয়ে অধিকাংশ কোম্পানি আগের হারেই ফি পরিশোধ করে। এ কারনে তাদের লাইসেন্স নবায়ন না করে আটকে রাখা হয়।
বীমা কোম্পানিগুলোর দাবি, তারা ২০২৫ সালের মধ্যেই আইন অনুযায়ী নবায়ন ফি পরিশোধ করেছে। তাই পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী অতিরিক্ত ফি দাবি করা আইনসঙ্গত নয়। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) বর্ধিত ফি ছাড়া লাইসেন্স নবায়নের অনুরোধ জানালেও সংগঠনের এ দাবী আমলে নেয়নি আইডিআরএ। অবশেষে বিষয়টি নিয়ে আইনি মতামত ও নির্দেশনা চেয়ে আইডিআরএ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আবেদন করেছে।
গত ২৬ এপ্রিল আইডিআরএ’র উপপরিচালক (নন-লাইফ) মো. সোলায়মান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জারি করা সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী বীমা কোম্পানির লাইসেন্স নবায়ন ফি প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে ২ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ অধিকাংশ কোম্পানি আগের হার অনুযায়ী প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে ১ টাকা জমা দিয়ে লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করেছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ সালে লাইসেন্স ফি ৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে কমিয়ে ১ টাকা নির্ধারণ করায় আইডিআরএ’র আয় কমে যায়। এদিকে জনবল বৃদ্ধি, ডিজিটাইজেশন এবং বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাইসেন্স ফি বাড়ানো হয়েছে।
আইডিআরএ’র তথ্যমতে, বর্ধিত ফি দিয়ে ইতোমধ্যে ৪টি লাইফ এবং ৯টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানি লাইসেন্স নবায়ন করেছে। তবে বাকি ৬৭টি কোম্পানি অতিরিক্ত ফি না দেওয়ায় তাদের লাইসেন্স নবায়ন সম্ভব হয়নি।
বীমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, পরবর্তী বছরের লাইসেন্স নবায়নের আবেদন ও ফি জমা দিতে হয় আগের বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে। সে অনুযায়ী বীমা কোম্পানিগুলো ২০২৫ সালের মধ্যেই ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত ফি জমা দেয়।
তবে ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি গেজেট আকারে প্রকাশিত সংশোধিত বিধিমালায় নবায়ন ফি বাড়িয়ে প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে ১ টাকা থেকে ২ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। এই নতুন হারই এখন বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু।
বীমা কোম্পানিগুলোর যুক্তি যে সময় তারা ফি জমা দিয়েছে, তখন পুরনো বিধিমালাই কার্যকর ছিল। তাই পরবর্তীতে সংশোধিত হার প্রয়োগ করে অতিরিক্ত ফি দাবি করা আইনসম্মত নয়।
আইডিআরএ বলছে, সংস্থাটির ব্যয় নির্বাহ সম্পূর্ণ নিজস্ব আয়ের ওপর নির্ভরশীল। ২০১৮ সালে ফি কমানোর ফলে আয় কমে যায়। এর মধ্যে জনবল বৃদ্ধি, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, ন্যাশনাল কোর ইন্স্যুরেন্স সলিউশনসহ বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের কারণে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই বাস্তবতায় ফি বাড়ানো প্রয়োজন হয়ে পড়ে এবং তা ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর করা হয়।
মাত্র ১৩টি কোম্পানি বর্ধিত ফি দিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করেছে। বাকি ৬৭টি কোম্পানি অতিরিক্ত ফি দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাদের লাইসেন্স ঝুলে আছে। বীমা খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লাইসেন্স নবায়ন না হলে কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম, নতুন ব্যবসা গ্রহণ এবং গ্রাহক আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইডিআরএ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে আইনগত মতামত ও নির্দেশনা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। ২৬ এপ্রিল পাঠানো ওই চিঠিতে ২০২৬ সালের জন্য কোন হারে নবায়ন ফি প্রযোজ্য হবে-সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
এদিকে, বর্ধিত ফি বাতিলের দাবিতে ইতোমধ্যে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তনয় কুমার সাহা জনস্বার্থে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে ৪ ফেব্রুয়ারির সংশোধনী বাতিল এবং ২০১৮ সালের ফি কাঠামো বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিরোধ মূলত “রেট্রোস্পেকটিভ প্রয়োগ” (পূর্ববর্তী সময়ের ওপর নতুন আইন প্রয়োগ) নিয়ে। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফি জমা দেওয়ার পর নতুন হার চাপিয়ে দেওয়া হলে তা আইনি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তারা আরও বলছেন, দ্রুত সমাধান না এলে বীমা খাতে আস্থার সংকট ˆতরি হতে পারে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
দেশের বীমা কোম্পানিগুলোর সংগঠন -বিআইএ এই বর্ধিত ফি ছাড়াই লাইসেন্স নবায়ন করে দিতে আইডিআরএকে চিঠি দিলেও তা রক্ষা করেনি। বরং এই ফি নিয়ে টানাপোড়েনের কথা জানিয়ে ইতিমধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা ও মতামত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি। গত ২৬ এপ্রিল আইডিআরএ’র পক্ষ থেকে উপপরিচালক (নন লাইফ) মোঃ সোলায়মান সচিব বরাবর এই চিঠি দিয়েছেন।