বিশেষ প্রতিনিধি :
ভূয়া ‘অধ্যাপক’ পদবী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে মেঘনা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেডের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এম, এ জাহের চৌধুরীর বিরুদ্ধে। নামের আগে ‘অধ্যাপক’ উল্লেখ করলেও আসলে তিনি কখনো কোনো কলেজের ‘অধ্যাপক’ ছিলেন না। অথচ ভোটার আইডি কার্ড, পাসপোর্ট, জীবন বৃত্তান্ত এমনকি কোম্পানির ওয়েব সাইট ও ভিজিটিং কার্ডেও নামের শুরুতে ‘অধ্যাপক’ পদবী ব্যবহার করছেন। বিষয়টি ‘সন্দেহজনক’ হওয়ায়- প্রশ্ন তুলেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।
মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের সিইও পদ শুন্য হলে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহের চৌধুরী কে ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব দেয় পরিচালনা পর্ষদ। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মুশফিক রহমান আইডিআরএ চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে ‘পরিচালনা পর্ষদ সভায় জাহের চৌধুরীকে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়ে চুড়ান্ত সিন্ধান্ত গৃহীত হওয়া সম্ভাবনা রয়েছে’ বলেও উল্লেখ করেন। আইডিআরএ জাহের চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালনের অনুমতির সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। একইসঙ্গে বীমা আইন ২০১০, বীমা কোম্পানী (মুখ্য কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ) প্রবিধানমালা ২০১২ অনুসরণ করে নতুন করে দক্ষ ও যোগ্য মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার নিয়োগ নির্দেশ দেয়।
আইডিআরএ দেয়া জাহের চৌধুরী জীবন বৃত্তান্তে নিজেকে ‘অধ্যাপক’ হিসেবে দাবী করেন। তবে, এম. এ জাহেরের অধ্যাপক পদবী ব্যবহার নিয়ে সন্দিহান আইডিআরএ। নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ জাহের চৌধুরী কোথায় এবং কোন প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেছেন- তা জানতে চেয়ে মেঘনাকে চিঠি দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
আইডিআরএ দেয়া জাহের চৌধুরীর জীবন বৃত্তান্তে দেখা যায় তিনি মাদ্রাসা থেকে আলিম ও ফাজিল পাশ করে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়ালেখা করেছেন। কিন্তু কোথায় তিনি অধ্যাপনা করেছেন তা স্পষ্ট করেননি। এমনকি এই প্রতিবেদক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রতারণাকে জাহের অভিনব শৈল্পিক রুপ দিয়েছেন। নিজেকে সব ক্ষেত্রে অধ্যাপক পরিচয় দিচ্ছেন; এটা অসুস্থ মানুষিকতার বহিঃপ্রকাশ। তাঁর ভুয়া কর্মকান্ড এবং অভিনব মিথ্যাচার নিয়ে সবাই ক্ষুদ্ধ- কিন্তু ভয়ে কেউ কথা বলছেন না। শিক্ষা জীবন থেকে নামের আগে অধ্যাপক ব্যবহার করেছেন তিনি। এটা হতে পারে প্রতারণা, কিংবা সামাজিক সম্মান আদায়ের অপকৌশল। বির্তকিত পদ ব্যবহার- প্রশ্নবোধক হয়ে সামনে আসা; মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের জন্য বিব্রতকর। এখন এটা নিয়ে আইডিআরএ থেকে প্রশ্ন তোলা হলে কি উত্তর দিবেন ভাবছেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বীমা খাতের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে জাল-জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। অনেক অর্ধ-শিক্ষিত এবং জাল সার্টিফিকেট ধারীরা এখনো সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যা লজ্জার। অনেকের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে আইডিআরএ। খাত সংস্কারে এই ভুয়া পরিচয়ধারীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। ডাক্তার কিংবা এডভোকেটসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে শুদ্ধি অভিযান পরিচালিত হলেও; অদৃশ্য কারণে বীমা খাত এখনো অন্ধকারে রয়েছে। এসব বাটপারদের বিরুদ্ধে আইডিআরএ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো বেশি কঠোর ভুমিকা পালন- সময়ের অন্যতম দাবী।
এ ব্যাপারে মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত সিইও এম এ জাহের চৌধুরী কে ফোন করা হলে মিডিয়াকে বলেন, ‘‘আমি ছাত্র জীবনে একটি কলেজে কিছু দিন চাকরী করেছি। তখন সবাই আমাকে অধ্যাপক হিসেবে ডাকতেন। জাতীয় পরিচয় পত্র, আইডি কার্ড, পাসপোর্টেও অধ্যাপক হিসেবে লিখা হয়েছে। আইডিআরএতে দেয়া জীবন বৃত্তান্তেও একইভাবে লিখা হয়েছে। আইডিআরএ থেকে কোন চিঠি পেলে জানিয়ে দিবো।”
তবে, তিনি কখনো প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী কিংবা অধ্যাপক হিসেবে- কোথাও দায়িত্ব পালন করেন নি বলেও জানান। একইসঙ্গে এভাবে পদবি ব্যবহার ভুল এবং অন্যায় বলে স্বীকার করেন।
এ প্রসঙ্গে আইডিআরএর এক কর্মকর্তা বলেন, বীমা খাতে একদিকে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অভাব রয়েছে। অন্যদিকে রয়েছে ইমেজ সংকট। অনেকেই নানান অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। মেঘনা ইন্সুরেন্সে সিইও নিয়োগ অনুমোদনে জাহের চৌধুরীর ‘অধ্যাপক’ পদবী ব্যবহার নজরে এসেছে। কোন ধরনের অনিয়ম, ভুয়া কিংবা ছলচাতুরী প্রমাণ হলে- আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
* প্রিয় পাঠক দীর্ঘ ১৬ বছর আওয়ামী ফ্যাসিবাদের আমলে কেমন ছিল মেঘনা ইন্সুরেন্স?
বীমা আইন লংঘন, অতিরিক্ত কমিশন, বাকি ব্যবসা, ভুয়া ব্যবসা- এ সকল নানা অনিয়মে যুক্ত এই বীমা কোম্পানিকে অনেক বার জরিমানা করেছে আইডিআরএ। সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠান মেঘনাকে নিয়ে আসছে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সঙ্গে থাকুন…