রেট নৈরাজ্য, কমিশন সংকট ও নীতিগত জটিলতা: সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া ঝুঁকিতে বীমা খাত

প্রকাশিত: ১:০৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬

এম হোসাইন আহমদ, বিশেষ প্রতিবেদনঃ
দেশের বীমা শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই নানা কাঠামোগত সমস্যা, নীতিগত অসামঞ্জস্য এবং বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতার চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রেট নির্ধারণে বিশৃঙ্খলা, কমিশন বন্ধ থাকার অভিযোগ এবং নতুন নিয়ন্ত্রক নীতির প্রভাব—এই তিনটি বিষয় একত্রে পুরো খাতকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এখনই কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এই সংকট ভবিষ্যতে বড় আর্থিক ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে।
বীমা একটি আস্থাভিত্তিক আর্থিক খাত। এখানে নিয়ম, স্বচ্ছতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা বজায় না থাকলে গ্রাহকের বিশ্বাস কমে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। বর্তমানে অভিযোগ উঠেছে—কিছু বড় কোম্পানি কেন্দ্রীয় রেট কাঠামো উপেক্ষা করে নিজেদের মতো করে কম প্রিমিয়াম নির্ধারণ করছে। এর ফলে বাজারে এক ধরনের “রেট নৈরাজ্য” তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত রেট না মেনে কম দামে বড় অঙ্কের ব্যবসা সংগ্রহ করা হলে ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না, ফলে বাজারের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
এ পরিস্থিতিতে খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সদস্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে নীতিগত সমন্বয়, ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং রেট সংক্রান্ত শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সংগঠনটির সক্রিয় ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ সংগঠনটি শুধু প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা নয়, বরং পুরো শিল্পের নৈতিক মানদণ্ড রক্ষার ক্ষেত্রেও একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম।
অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সম্প্রতি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির বিপণন কাঠামোতে একটি নতুন নিয়ম চালু করেছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বিপণন কর্মকর্তা বা প্রিমিয়াম সংগ্রাহক কর্মীরা নির্ধারিত ব্যক্তিগত টার্গেট পূরণ করতে না পারলে তারা মাসিক বেতন বা ভাতা পাবেন না। আগে যেখানে টার্গেটের অর্ধেক অর্জন করলেও আংশিক বেতন সুবিধা পাওয়া যেত, এখন তা সম্পূর্ণভাবে বাতিল হয়েছে। এই নীতির ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিপণন কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে প্রিমিয়াম সংগ্রহ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। অর্থনৈতিক চাপ, প্রতিযোগিতামূলক রেট এবং গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তনের কারণে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নতুন নিয়ম তাদের কর্মপ্রেরণা কমিয়ে দিচ্ছে এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। অনেক কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকও বলছেন, এই নীতিগত বাধ্যবাধকতার কারণে তারা কর্মীদের জন্য আলাদা কোনো সুবিধা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না—অর্থাৎ বিষয়টি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
কমিশন ইস্যুও বর্তমানে বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কমিশন বন্ধ থাকার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, কিছু কোম্পানি এখনও অনানুষ্ঠানিকভাবে কমিশন দিচ্ছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, কিছু প্রতিষ্ঠানে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দেওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে, যা যদি সত্য হয় তবে তা শুধু নীতিমালা লঙ্ঘনই নয়—বরং বাজারে অসুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করার মতো গুরুতর বিষয়। কারণ যখন একটি প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে চলে আর অন্যটি গোপনে অতিরিক্ত সুবিধা দেয়, তখন বাজারের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মহল আইডিআরএকে দ্রুত তদন্ত ও বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে। অন্যথায় নিয়ম মেনে চলা কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো শিল্পের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বীমা শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। শিল্প, বাণিজ্য, অবকাঠামো, কৃষি এবং ব্যক্তিগত সম্পদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বীমার ভূমিকা অপরিসীম। তাই এই খাতে কোনো ধরনের অস্থিরতা শুধু কোম্পানি বা কর্মীদের নয়—সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ-এর মতো উন্নয়নশীল দেশে আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি প্রধান ভিত্তি হলো শক্তিশালী বীমা খাত।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের মূল কারণ তিনটি—নীতিমালার অসামঞ্জস্য, প্রয়োগের দুর্বলতা এবং সমন্বয়ের অভাব। আইডিআরএ নীতি প্রণয়ন করে, বিআইএ শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংগঠন বাজারের বাস্তবতা তুলে ধরে—কিন্তু এই তিন স্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। তাই যৌথ উদ্যোগ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
সমাধানের জন্য কয়েকটি সুপারিশ ইতিমধ্যে আলোচনায় এসেছে—
প্রথমত, রেট নির্ধারণে কেন্দ্রীয় কাঠামো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কমিশন সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে স্বচ্ছ প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত।
তৃতীয়ত, বিপণন কর্মকর্তাদের বেতন নীতিতে বাস্তবসম্মত সংশোধন আনা প্রয়োজন, যাতে কর্মীরা নিরাপত্তা বোধ নিয়ে কাজ করতে পারেন।
চতুর্থত, শিল্পের সব অংশীজনকে নিয়ে নিয়মিত সমন্বয় বৈঠক চালু করা যেতে পারে, যেখানে বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বীমা শিল্পে আস্থা পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি। বড় কোম্পানির প্রভাব খাটিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে সমান সুযোগের প্রতিযোগিতাই হতে পারে স্থিতিশীলতার একমাত্র পথ। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়সঙ্গত নীতিমালা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত শুধু সংকট কাটিয়ে উঠবে না—বরং দেশের আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি আহ্বান—রেট নৈরাজ্য বন্ধ করুন, কমিশন জটিলতার সমাধান করুন এবং বাস্তবসম্মত নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে বীমা খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনুন। সমন্বিত ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই পারে এই আস্থাভিত্তিক শিল্পকে নতুন করে স্থিতিশীলতা ও শক্ত ভিত্তি এনে দিতে।