এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, সিপিবি এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণে জানাজার মাধ্যমে বিদায় জানানো হলো রণাঙ্গণের সেনানী, সাবেক মন্ত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বেলা সোয়া ১১টায় চট্টগ্রাম নগরীর জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
সকাল ১০টা থেকেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জানাজায় অংশ নিতে মাঠে জড়ো হতে থাকেন। জানাজা শেষে মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলে চারদিক থেকে হাজারো সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক সহচর ও অনুসারী ‘বীর চট্টলার মোশাররফ ভাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই’, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ এবং ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
পরে নেতাকর্মীরা মরদেহবাহী গাড়ির সঙ্গে জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ মাঠ থেকে বের হয়ে আসেন। এ সময় মাঠের মূল ফটকে পুলিশ সদস্যদের অবস্থান দেখা যায়। অ্যাম্বুলেন্সটি মীরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়। জানাজায় সব রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “বর্ণাঢ্য একজন রাজনীতিবিদ বৃহত্তর চট্টগ্রামের জন্য অনেক অবদান রেখেছেন। মহানগর বিএনপি, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তার অবদানের জন্য চট্টগ্রামবাসী সবসময় তাকে স্মরণে রাখবে।”
উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান বলেন, “একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সারাজীবন তার সঙ্গে রাজনীতি করেছি। তিনি আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেলেন।”
সাবেক সিটি মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “পাকিস্তান আমল থেকে তার সঙ্গে আমার স্মৃতি। চট্টগ্রামের উন্নয়নে তিনি অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সারির নেতা ছিলেন তিনি। উন্নয়ন পরিকল্পনা তিনি খুব ভালো বুঝতেন। মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন।”
মোশাররফ হোসেনের ছেলে সাবেদুর রহমান বলেন, “দীর্ঘদিন আইসিইউতে থাকার পর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। দেশের উন্নয়নে কাজ করেছেন। সবার কাছে বাবার জন্য দোয়া চাই। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেবেন।”
এ সময় সিপিবি নেতা মোহাম্মদ শাহ আলম, ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনী, মীরসরাই অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা শ্রদ্ধা জানান। জানাজায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, সিপিবিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। লাহোরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় তিনি ছয় দফা আন্দোলনে যুক্ত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনের নেতৃত্ব দেন।
১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আমৃত্যু তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।
১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এবং পরে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪-২০১৯ মেয়াদেও তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট তাকে কারা হাসপাতাল থেকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ১৪ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান তিনি।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তিন ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। তার ছেলে মাহবুব রহমান রুহেল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বৃহস্পতিবার বিকালে মীরসরাইয়ে দাফনের আগে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে।