স্বচ্ছতা-আস্থার প্রশ্নঃ আইডিআরএ’র ‘অ্যাওয়ার্ড বাণিজ্য’ প্রকাশিত: ৫:৩৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৯, ২০২৬ বিশেষ বিজ্ঞপ্তিঃ বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ‘আইডিআরএ ইন্স্যুরেন্স এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু পুরস্কার প্রদানের জন্য নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা প্রকাশের পর থেকেই প্রশ্ন উঠছে—এটি কি যোগ্যতার স্বীকৃতি, নাকি ‘অ্যাওয়ার্ড বাণিজ্য’? বীমা খাতে সুশাসন ও মান উন্নয়নের স্বীকৃতি হিসেবে ‘আইডিআরএ ইন্স্যুরেন্স এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। কিন্তু পুরস্কার প্রদানের জন্য নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা প্রকাশের পর থেকেই খাত সংশ্লিষ্ঠদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি যোগ্যতার স্বীকৃতি, নাকি ‘অ্যাওয়ার্ড বাণিজ্য’? আইডিআরএ জানিয়েছে, লাইফ ও নন-লাইফ বীমা খাতের মোট ১৩টি প্রতিষ্ঠানকে এই পুরস্কার দেওয়া হবে। নন-লাইফ খাতে ৭টি এবং লাইফ খাতে ৬টি প্রতিষ্ঠানকে ‘সেরা’ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। ১৮ জানুয়ারি আইডিআরএয়ের নির্বাহী পরিচালক (নন-লাইফ) মনিরা বেগমের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে এ বিষয়ে জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বীমা খাতে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি, জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভালো কাজকে পুরস্কৃত করা এই অ্যাওয়ার্ডের লক্ষ্য। আইডিআরএয়ের ১৯২তম সভায় উদ্যোগটি অনুমোদনের পর লাইফ ও নন-লাইফ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশাসন, পরিচালনা ও পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করে বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে প্রথম থেকে পঞ্চম স্থান নির্ধারণ করা হয়। তবে এই তালিকা প্রকাশের পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—এমন একটি পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে কোন কোন মানদণ্ড (ক্রাইটেরিয়া) অনুসরণ করা হয়েছে, সেই বিষয়ে আইডিআরএ কেন বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি? মূল্যায়নের সূচক, ওজন এবং তথ্যসূত্র প্রকাশ না করা হলে পুরো প্রক্রিয়াটিকে স্বচ্ছ বলা কঠিন। সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হলো, কিছু প্রতিষ্ঠান আইন ও নিয়ন্ত্রক শর্ত লঙ্ঘন করলেও তাদের ‘এক্সিলেন্স’ হিসেবে বাছাই করা হয়েছে। বীমা আইন অনুযায়ী বীমা কোম্পানিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বীমা খাতের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করছেন, নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এমন কয়েকটি আছে যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে এ শর্ত পূরণ করছে না। একাধিক বীমা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদ দীর্ঘ সময় শূন্য থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রতিষ্ঠান পুরস্কারের তালিকায় এসেছে। আইন অনুযায়ী সিইও পদ তিন মাসের বেশি খালি রাখা যাবে না; তবে অনুমোদিত হলে আরও তিন মাস সময় দেওয়া যায়। মোট মিলিয়ে ছয় মাসের বেশি শূন্য রাখা যাবে না। ছয় মাস অতিবাহিত হলে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রয়েছে। তবু কিছু প্রতিষ্ঠানে সিইও পদ দীর্ঘ সময় শূন্য থাকার তথ্য থাকলেও তারা পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছে—এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাবমূতির জন্য প্রশ্ন তৈরি করছে। অন্যদিকে, বীমা খাতের অনেক অংশ মনে করছে, অ্যাওয়ার্ড প্রদানের জন্য নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কিছু পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। বিশেষ করে সাধারণ বীমা করপোরেশন, মেটলাইফ, জীবন বীমা করপোরেশন ও গার্ডিয়ান লাইফের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকাভুক্তি নেই। আবার গার্ডিয়ান লাইফের ক্ষেত্রে ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত সিইও পদ শূন্য ছিল বলে জানা গেছে। এছাড়া অ্যাওয়ার্ডের জন্য প্রথম থেকে পঞ্চম স্থান নির্ধারণ করা হলেও কেন একই অবস্থানে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে রাখা হয়েছে, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার চিঠিতে কোনো ব্যাখ্যা নেই। অ্যাওয়ার্ডের তালিকায় সাধারণ বীমা খাতে প্রথম স্থানে আছে প্রগতি ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড। দ্বিতীয় স্থানে সাধারণ বীমা করপোরেশন, তৃতীয় রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, চতুর্থ গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, সেনা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ও ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড (যৌথভাবে)। জীবন বীমা খাতে প্রথম স্থানে আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড (মেটলাইফ), দ্বিতীয় স্থানে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, তৃতীয় ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, চতুর্থ জীবন বীমা করপোরেশন এবং পঞ্চম স্থানে রয়েছে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ও গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড (যৌথভাবে)। বীমা খাতের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, বীমা আইন ও নিয়ন্ত্রক শর্তের মানদণ্ডে কিছু প্রতিষ্ঠান কার্যত অযোগ্য, তবু তাদেরকে ‘সেরা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এতে সাধারণত আইন মানা প্রতিষ্ঠানগুলো নিরুৎসাহিত হবে। তারা মনে করছেন, মানদণ্ড প্রকাশ না করে নির্বাচন করা হলে অ্যাওয়ার্ডের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে কম হলেও তারা অ্যাওয়ার্ড তালিকায় এসেছে। এতে বোঝা যায়, পারফরম্যান্সের বদলে অন্য বিবেচনা কার্যকর ছিল। এছাড়া কোনও অংশগ্রহণকারী বা সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হয়নি। মূল্যায়নের কাগজপত্র, তথ্যসূত্র বা পর্যালোচনার রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি। তাই পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়নি—এটাই তাদের মূল দাবি। অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের খরচ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইডিআরএ’র বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অ্যাওয়ার্ডের অনুষ্ঠানের খরচ বহন করতে হবে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এই শর্তও অনেকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হচ্ছে। কারণ এটি বীমা খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বীকৃতি বা সম্মান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বদলে, ‘অর্থ দিয়ে কেনা সম্মান’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত একটি কোম্পানির সিইও বলেছেন, অ্যাওয়ার্ড উদ্যোগটি ভালো। তবে নির্বাচিত কিছু কোম্পানির নাম দেখে আমরাও অবাক হয়েছি। স্বচ্ছতা না থাকলে এমন উদ্যোগ বিতর্কের জন্ম দেয়। অন্য একটি কোম্পানির সিইও বলেন, আইডিআরএ বলেছে অনুষ্ঠানের খরচ আমাদের বহন করতে হবে। কিন্তু কত টাকা দিতে হবে, তা এখনও জানায়নি। আমরা কোনোভাবে নেগোসিয়েশন করিনি। অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত কোম্পানির কাছ থেকে অনুষ্ঠানের অর্থ নেওয়ার বিষয়ে আইডিআরএর পরামর্শক (মিডিয়া এবং যোগাযোগ) ও মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি দাবি করেছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা অ্যাওয়ার্ডটা আমাদের এখানেই (নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যালয়ে) দিতে চেয়েছিল, কিন্তু আমাদের সরকারের তো এই বাবদ খরচ করার বাজেট নেই। ওনারা বলেছেন (অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত কোম্পানি) এটা ওনাদের অর্জন, তাই ওনারা সবাই মিলে অংশগ্রহণ করবেন (ব্যয় বহন করা)। তিনি বলেন, অনেকে ওনাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার বিষয়টিকে নানানভাবে দেখছেন। কিন্তু ওনাদের সঙ্গে তো আমাদের অন্য কোনো লেনদেন নেই। শুধু অনুষ্ঠানের জন্য যে খরচ, সেটা ওনারা দেবেন। আমাদের বাজেট থেকে আসলে ওই খাতে খরচ করার সামর্থ্য নেই। আইন লঙ্ঘন করা প্রতিষ্ঠানকে অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আইডিআরএ মুখপাত্র বলেন, না না, ওরকম কিছু নেই। ওগুলো জানানো হবে। অতালিকাভুক্ত কোম্পানি তো আছে—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, না, সেটাও নেই। এসময় অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত অতালিকাভুক্ত কোম্পানির নাম উল্লেখ করা হলে সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, সব পরে জানানো হবে। SHARES অর্থনীতি বিষয়: