হঠকারী সিদ্ধান্তে সমালোচনার মুখে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স: সিইও আব্দুল খালেককে পুনর্বহাল ও সুবিধা অব্যাহত রাখার দাবি

প্রকাশিত: ১:৩৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০২৫

নিজস্ব প্রতিবেদক : ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আব্দুল খালেক মিয়ার চাকরি অবসান পত্র আইনানুগ প্রক্রিয়া না মেনে ইস্যু করায় তা না-মঞ্জুর করেছে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ (Insurance Development and Regulatory Authority)। সংস্থাটি জানায়, কোম্পানি ঝটপট যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে—তা আইনি কাঠামো ও কর্পোরেট গভর্নেন্স নীতিমালা স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করেছে।

২০ আগস্ট কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদের স্বাক্ষরে খালেক মিয়াকে চাকরি অবসানের পত্র দেওয়া হয়। ২৪ আগস্ট তাঁর বরাদ্দকৃত গাড়িও ফেরত নেওয়া হয়। মাত্র পাঁচ দিন পর, ২৫ আগস্ট, তাঁকে নতুন করে বাধ্যতামূলক ছুটির পত্র দেওয়া হয়—যা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে আরও প্রশ্নের জন্ম দেয়।

আইনগত প্রক্রিয়া উপেক্ষার অভিযোগ

আইডিআরএ–র মতে, সিইও নিয়োগ অথবা অপসারণ—উভয় ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু কোম্পানি একক সিদ্ধান্তে চাকরি অবসান, বাধ্যতামূলক ছুটি, গাড়ি ফেরত নেওয়া এবং তদন্ত কমিটি গঠন করেছে—যা স্পষ্টতই আইনবহির্ভূত।

শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য,
“কোনো বোর্ড বা তার একজন সদস্য এককভাবে সিইও অপসারণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এতে ক্ষমতার অপব্যবহার, অস্বচ্ছতা এবং কর্পোরেট গভর্নেন্স ভঙ্গের সম্ভাবনা তৈরি হয়।”

চাপ প্রয়োগের অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, ১৭ আগস্ট ভাইস চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ এবং কোম্পানি সেক্রেটারি চৌধুরী এহসানুল হক সিইওকে ইস্তফা দিতে চাপ দেন। এমনকি তাঁকে বাসায় গিয়েও চাপ প্রয়োগের বিষয়টি খালেক মিয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে লিখিতভাবে জানান।
২০ আগস্ট তিনি ই-মেইলের মাধ্যমে সমস্ত ঘটনা আইডিআরএকে অবহিত করেন।

সিইও আব্দুল খালেকের বক্তব্য

তিনি বলেন—
“আমার ওপর যা করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ বেআইনী। আইডিআরএর অনুমোদন ছাড়া চাকরি অবসান, বরাদ্দকৃত গাড়ি প্রত্যাহার এবং বেতন–ভাতা আটকে রাখা—সবই আইনবহির্ভূত।”

তিনি আরও জানান, তাঁর দায়িত্বকালেই কোম্পানির প্রিমিয়াম আয় বৃদ্ধি পায় এবং পরপর দুই বছর যথাক্রমে ১৫% ও ২০% ডিভিডেন্ড ঘোষণা করা হয়।

বিতর্কের কেন্দ্র: ভারপ্রাপ্ত সিইও নিয়োগ

সমালোচনার মধ্যে কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর ছাড়াই অন্য একজন পরিচালকের স্বাক্ষরে মো. মইনুল হাসান চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বিস্ময় তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—
বোর্ড মিটিং ছাড়াই ভারপ্রাপ্ত সিইও নিয়োগ হলো কীভাবে?
এবং
চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর না করে একজন পরিচালক কীভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করলেন?

শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ আইনসিদ্ধ নয় এবং এটি সংস্থার অভ্যন্তরীণ সংকট ও ক্ষমতার অস্বচ্ছ ব্যবহারের ইঙ্গিত বহন করে।

বোর্ড মিটিং ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

আইডিআরএর মিডিয়া ও কমিউনিকেশন পরামর্শক সাইফুন্নাহার সুমি ২৬ আগস্ট বলেন,
“সিইও অপসারণের ক্ষেত্রে আইনগত পদ্ধতি মানা হয়নি। তাই চাকরি অবসান পত্রটি কর্তৃপক্ষ না-মঞ্জুর করেছে।”

বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন—
বোর্ড মিটিং ছাড়া, প্রয়োজনীয় কোরাম ছাড়াই কীভাবে ভাইস চেয়ারম্যান বা কোনো পরিচালক এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?
তাদের মতে, এই ধরনের পদক্ষেপ সুশাসন ও সাংগঠনিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।

পরিচালকদের অনুপস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা

বিভিন্ন সূত্র জানায়, গত সরকার পরিবর্তনের পর কোম্পানির কিছু পরিচালক দেশত্যাগ বা আত্মগোপন করায় প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়। এই সুযোগে কিছু ব্যক্তি এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
অভিযোগ রয়েছে—
অবৈধ সুবিধা না দেওয়া এবং স্বচ্ছতার নীতি বজায় রাখায় সিইওর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বিআইএফ–এর উদ্বেগ

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ)-এর যৌথ মহাসচিব এস এম নুরুজ্জামান বলেন—
“এটা শুধু একজন সিইওর ইস্যু নয়। এ ধরনের বেআইনী অপসারণ পুরো বীমা খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। আইন মেনে প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কাউকে অপসারণ করা যায় না।”

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: দ্রুত সমাধানের আহ্বান

বীমা খাত বিশ্লেষকদের মতে—
ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে কোম্পানির পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সুনামও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তারা নিম্নোক্ত পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন—

১. সিইও আব্দুল খালেক মিয়াকে পুনর্বহাল
২. সমস্ত সুবিধা ও প্রাপ্যতা অব্যাহত রাখা
৩. পরিচালনা পর্ষদের আইনানুগ কাঠামো পুনর্গঠন
৪. একক সিদ্ধান্ত বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ

তাদের মতে, এসব বাস্তবায়ন হলে কোম্পানির স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং বীমা খাতে আস্থাও পুনরুদ্ধার হবে।