৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা, ঋণ বিতরণে ধীরগতি

প্রকাশিত: ৬:৫৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিনিধি :

বন্ধ কলকারখানা চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার কথা। তবে ঘোষণার চার মাস পরও ঋণ বিতরণে গতি আসেনি। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তহবিল থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হলেও সরাসরি গ্রাহকদের কাছে গেছে এক হাজার কোটি টাকারও কম। এর মধ্যে বন্ধ কারখানা চালুর জন্য ঋণ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা।

এ অবস্থায় ঋণ বিতরণ বাড়াতে শর্ত শিথিল ও সুদহার কমানোর উপায় খুঁজছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নিয়ে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সাবেক ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এই তহবিলের মাধ্যমে বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর পাশাপাশি ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু ঋণ বিতরণে ধীরগতির কারণে সেই উদ্যোগের সুফল এখনো শিল্প খাতে দৃশ্যমান নয়। উল্টো জ্বালানিসংকটসহ নানা সমস্যায় চাপে রয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকের কাজ হলো ঝুঁকি বিবেচনা করে ঋণ দেওয়া। বর্তমানে ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণে জর্জরিত। তাই ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংকগুলো যথাযথ যাচাই-বাছাই করছে। বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো আবার চালু হওয়ার মতো সক্ষমতা রাখে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
কোন খাতে কত টাকা

গত মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে তা বাড়িয়ে ৬২ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা বিতরণের কথা। এসব ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ।

ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ করা ৪১ হাজার কোটি টাকার মধ্যে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া কটেজ, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরাঞ্চলে কৃষি হাব গড়ে তুলতে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

পুনঃ অর্থায়ন তহবিলের ২১ হাজার কোটি টাকার মধ্যে প্রি-শিপমেন্ট ফাইন্যান্স ও প্যাকিং ক্রেডিটে ৭ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) মাধ্যমে কুটির ও ক্ষুদ্র খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক ও আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে ১ হাজার কোটি টাকা করে বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব খাতে ১ হাজার কোটি টাকা, সৃজনশীল অর্থনীতি ও স্টার্টআপের জন্য ৫০০ কোটি টাকা করে এবং হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি এবং চামড়া ও জুতা রপ্তানি খাতে ২ হাজার কোটি টাকা করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সিএমএসএমই, উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ করা তহবিল থেকে এখনো কোনো ঋণ বিতরণ হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এ প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। তহবিল থেকে ঋণ বিতরণ চলছে। বিতরণের গতি বাড়াতে আরও কোনো উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন কি না, তা জানতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ঋণ বিতরণ বাড়াতে গত মঙ্গলবার শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ব্যাংকারদের সঙ্গেও আলোচনা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঋণ বিতরণ বাড়ানোর উপায় নিয়ে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের পরামর্শে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, কম সুদের এ ঋণ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যোগ্য উদ্যোক্তাদের দিতে হবে। শুধু ঋণ বিতরণের জন্য ঋণ দেওয়া হলে ব্যাংক খাতে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। তাই ঋণ বিতরণে চাপ না দিয়ে তদারকি বাড়ানো উচিত, যাতে অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।

অন্যদিকে, বন্ধ বা আংশিক বন্ধ কারখানার সম্পদ, উৎপাদন সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যাচাই করে অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, বন্ধ প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে খেলাপি হওয়াকে একমাত্র অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা না করে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা অনুযায়ী অর্থায়নের সুযোগ দিতে হবে।
একই শিল্পগোষ্ঠীর একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপির কারণে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকিং সুবিধা বন্ধ না করা, খেলাপিমুক্ত হতে ২ শতাংশ নগদ অর্থ জমার শর্ত প্রত্যাহার এবং ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ দ্রুত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি ঋণ আবেদন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা, মেয়াদি ঋণের কিস্তি পরিশোধে আরও সময় দেওয়া এবং খেলাপিমুক্ত হওয়ার নীতিগত সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বন্ধ কলকারখানা চালুর বিকল্প নেই। নতুন কারখানা তৈরি করতে কয়েক বছর সময় লাগে। সে তুলনায় বন্ধ কারখানা চালু করা সহজ ও কম সময়সাপেক্ষ। তাই প্রণোদনা তহবিলের ঋণ বিতরণ বাড়াতে কিছু শর্ত শিথিলের দাবি জানিয়েছেন তারা।