হরমুজ সংকটে বাড়ছে বীমা ঝুঁকি ও আমদানি ব্যয়, সার সরবরাহে অনিশ্চয়তা প্রকাশিত: ৩:৪৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৯, ২০২৬ আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনা কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে। এই অস্থিরতার ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি ও সার আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং একই সঙ্গে মেরিন বীমা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়ে সামগ্রিক আমদানি খরচ ও কৃষি অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক শিপিং ও বীমা খাত সংশ্লিষ্ট তথ্য, বিশেষ করে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল-এর বাজার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর হয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য যুদ্ধঝুঁকি বীমা বা ওয়ার রিস্ক ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিকে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর ফলে জাহাজ মালিকদের অতিরিক্ত বীমা কভার নিতে হচ্ছে এবং কার্গো ইন্স্যুরেন্সের খরচও বাড়ছে। পাশাপাশি ক্লেইম ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে পুনর্বীমা ব্যয়ও বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত আমদানিকারকদের ওপর বাড়তি খরচ হিসেবে চাপ তৈরি করছে এবং পণ্যের বাজারমূল্যে প্রতিফলিত হচ্ছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে শিপিং খাতেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জাহাজ চলাচলে বিলম্ব, রুট ঝুঁকি এবং অপারেশনাল ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক লজিস্টিক খরচ বেড়েছে। বাংলাদেশ-সম্পর্কিত সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, এপ্রিল ২০২৬ মাসে প্রায় ৫ লাখ টন এলএনজি এবং ৭৯ হাজার টন অপরিশোধিত তেল বহনের জন্য ৬টি জাহাজের একটি তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে মার্চ ২০২৬-এ জ্বালানি বহনকারী ১৭টি জাহাজের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি, যা সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর চাপকে আরও স্পষ্ট করেছে। খাত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু রুটে কন্টেইনার পরিবহন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যদিও এই বৃদ্ধি রুট ও ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী ভিন্ন হচ্ছে। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে সার আমদানিতে, কারণ বাংলাদেশের কৃষি খাত আমদানিকৃত সারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত এবং ডিএপি সারের দাম প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে বাজার সংশ্লিষ্ট তথ্য ইঙ্গিত করছে। একই সঙ্গে আমদানিতে অতিরিক্ত ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি প্রিমিয়াম যুক্ত হওয়ায় সারের মোট আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সরকার বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়া থেকে পটাশ বা এমওপি সার আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার আওতায় প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। মরক্কোর ওসিপি গ্রুপ থেকে ডিএপি ও টিএসপি, কানাডা থেকে পটাশ এবং চীন ও মিসর থেকে ইউরিয়া ও অন্যান্য সার সংগ্রহের প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়েছে। তবে এসব উৎস থেকে আমদানিতে দীর্ঘ দূরত্ব এবং উচ্চ পরিবহন ব্যয়ের কারণে খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি হচ্ছে, যা সামগ্রিক ব্যয় কমানোর প্রচেষ্টাকে সীমিত করছে। সারের দাম ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে কৃষি খাতে পড়তে শুরু করেছে। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রতি বিঘা জমিতে কৃষকের অতিরিক্ত খরচ প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কৃষকরা যদি প্রয়োজনের তুলনায় কম সার ব্যবহার করেন, তবে ফসলের ফলন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এর ফলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে গিয়ে চাল, গম, ভুট্টা ও সবজির বাজারমূল্য বাড়তে পারে এবং সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার সারের ওপর বড় অঙ্কের ভর্তুকি অব্যাহত রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতে ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যদিও কৃষি মন্ত্রণালয়ের চাহিদা ছিল প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতি ৫০ কেজি এমওপি সারে সরকার প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দিচ্ছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে ভর্তুকি পরিশোধের জন্য ৩ হাজার ১৬ কোটি টাকার বিশেষ বন্ড ইস্যু করা হয়েছে। তবে বীমা প্রিমিয়াম ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই ভর্তুকির প্রকৃত চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বীমা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য উন্নত মেরিন ইন্স্যুরেন্স কাঠামো, শক্তিশালী পুনর্বীমা সুরক্ষা এবং বিকল্প শিপিং রুট ব্যবহারের কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে আমদানি উৎস বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় উৎপাদন জোরদার করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা এখন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি বৈদেশিক নীতিগত চ্যালেঞ্জ নয়; এটি বীমা খাত, আমদানি ব্যয় এবং কৃষি অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। যুদ্ধঝুঁকি বীমার প্রিমিয়াম বৃদ্ধি, শিপিং ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তা- সব মিলিয়ে সার আমদানির খরচ বাড়ছে। ফলে আমদানি নির্ভর কৃষি খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। SHARES অর্থ নিউজ বিষয়: