পাহাড়সম অভিযোগের পরও বহাল তবিয়াতে দায়িত্বে সোনালী ব্যাংকের ডিজিএম সেলিম হায়দার: তদন্তের পরও নেই দৃশ্যমান ব্যবস্থা প্রকাশিত: ৯:১৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১, ২০২৬ ক্রাইম রিপোর্টার রিপোর্টারঃ সাম্প্রতিক সময়ে পটুয়াখালী প্রিন্সিপাল অফিসের দায়িত্বে থাকা সোনালী ব্যাংকের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মোঃ সেলিম হায়দারের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠলেও তিনি এখনো বহাল তবিয়াতে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে। অভিযোগের পরিমাণ ও গুরুত্ব বিবেচনায় বিষয়টি ব্যাংক খাতজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে দৈনিক বাংলাদেশ সমাচার এবং ৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে দৈনিক গড়ব বাংলাদেশ পত্রিকায় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে জানা গেছে। এতে করে তদন্তের অগ্রগতি ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পটুয়াখালী সোনালী ব্যাংক ভবনের আবাসিক ভাড়ার টাকা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা না রেখে নিজের একক স্বাক্ষরে হিসাব খুলে সংরক্ষণ করে আত্মসাৎ করেছেন তিনি। এছাড়া অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে বরিশাল শহরে বিলাসবহুল বাড়ি ও মার্কেট নির্মাণের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য একাধিক আধুনিক গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে, যা তার আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায়ও তার বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ রয়েছে। পছন্দের কর্মকর্তাদের সুবিধাজনক স্থানে বদলি এবং অপছন্দেরদের শাস্তিমূলক বদলি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। এছাড়া ব্যাংকের অফিসিয়াল গাড়ি ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক ও সামাজিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে, যা সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের শামিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন এবং ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময় তিনি সরকার-সমর্থিত ব্যক্তিদের নিয়মবহির্ভূত সুবিধা প্রদান করেছেন। তবে ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে নতুনভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে এনসিপি নেতা সার্জিস আলমের শ্বশুর জনাব ব্যারিষ্টার লুৎফর রহমানের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে পুনরায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ, অনিয়ম, অস্থির কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন শাখায় অনিয়মের অভিযোগ নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বিএনপি-সমর্থিত শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। জ্বালানি তেলের সংকটময় পরিস্থিতিতেও তিনি সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত গাড়ি থাকা সত্ত্বেও প্রতি বৃহস্পতিবার ও রবিবার অফিসের গাড়িতে যাতায়াত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ২২ মার্চ ২০২৬ তারিখে অফিসের গাড়িতে স্বপরিবারে বন্ধুর বিয়েতে যোগদান, ২৩ মার্চ নিজ শ্বশুরবাড়ি আমতলী ভ্রমণ এবং ২৪ মার্চ বরগুনা থেকে পরিবার নিয়ে বরিশাল হয়ে পুনরায় পটুয়াখালীর অফিসে ফেরার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনাকে সরকারি সম্পদের ব্যক্তিগত ব্যবহার হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে—কিসের জোরে বহাল তবিয়াতে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন এই কর্মকর্তা? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার প্রভাবের অন্যতম উৎস হিসেবে প্রধান কার্যালয়ের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের ডিজিএম গোলাম মহিউদ্দিন আহমেদের নাম উঠে এসেছে, যিনি তার ব্যাচমেট। এই ডিভিশন থেকেই সকল ধরনের বদলি ও পদায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সেলিম হায়দার ও গোলাম মহিউদ্দিন আহমেদ ১৯৯৮ সালে একসঙ্গে অফিসার হিসেবে ব্যাংকে যোগদান করেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, সোনালী ব্যাংকের ১৯৯৮ ব্যাচটি বর্তমানে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তাদের আরেক সদস্য মঞ্জুর মোর্শেদ দীর্ঘদিন ধরে এইচআরডিডিতে কর্মরত রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রভাবশালী ব্যাচই মূলত সেলিম হায়দারের মতো কর্মকর্তাদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। ব্যাংকের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট একাধিকবার তাকে বদলির সিদ্ধান্ত নিলেও গোলাম মহিউদ্দিনের প্রভাবের কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের তালিকা এখানেই শেষ নয়। তার অধীনস্থ তালতলা শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঈদ বোনাস ৫ মার্চ প্রদান করা হয়, যেখানে সোনালী ব্যাংকের অন্যান্য শাখায় তা ১ মার্চ দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় অসন্তোষ সৃষ্টি হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তালতলা শাখার ম্যানেজার রেজাউল করিম, যিনি সেলিম হায়দারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, তাকে বোনাস বিতরণে বিলম্বের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বরগুনা কোর্ট বিল্ডিং শাখায় ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, রেজাউল করিমের পূর্বতন শাখাও ছিল বরগুনা কোর্ট বিল্ডিং, যা প্রচলিত নিয়মের পরিপন্থী। সাধারণত একই শাখায় পুনরায় পোস্টিং দেওয়া হয় না, কিন্তু এ ক্ষেত্রে নিয়মের তোয়াক্কা করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে সেলিম হায়দারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের নয়, বরং পুরো ব্যাংক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এসব অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। SHARES অর্থ নিউজ বিষয়: