কাগজে আদেশ, কাজে নেই প্রয়োগ: ‘সিদ্ধান্ত-পলায়ন’ সংস্কৃতিতে ধুঁকছে দেশের বীমা খাত

প্রকাশিত: ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৫, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিনিধি :
​দেশের বীমা খাতের অভিভাবক সংস্থা ‘বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ (IDRA) এক দশকের বেশি সময় পার করলেও মাঠপর্যায়ে এর সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শক্তিশালী নীতিমালা ও কাঠামোগত সংস্কারের বুলি শোনা গেলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুত ‘সিদ্ধান্ত-পলায়ন’ সংস্কৃতি। ফলে গ্রাহক, বিনিয়োগকারী এবং সৎ পেশাজীবীদের মধ্যে আস্থার সংকট প্রকট হয়ে উঠছে।
​নীতি বনাম বাস্তবায়ন: ফাইলবন্দি, সিদ্ধান্ত পলায়ন যখন সমাধান:-
​আইডিআরএ নিয়মিত শুনানি আয়োজন করে এবং বীমা কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কঠোর নির্দেশনা দেয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই লিখিত আদেশগুলো মাসের পর মাস ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকে। এই প্রশাসনিক স্থবিরতা কেবল আইনি ব্যর্থতা নয়, বরং খাতের শৃঙ্খলা ও নৈতিক মানদণ্ডকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, “আদেশ দেওয়া হয় দেখানোর জন্য, আর ফাইল আটকে রাখা হয় ম্যানেজ হওয়ার জন্য।”
​স্থবিরতার নেপথ্যে তিন কারণ
​তদন্তে বীমা খাতের এই অচলাবস্থার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে:
​প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ: অনেক ক্ষেত্রে স্বার্থান্বেষী মহলের অদৃশ্য চাপ সাহসী ও সঠিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
​জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি: কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করলেও সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানি বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
​ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা: অ্যাড-হক বা ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বের কারণে নীতিনির্ধারকরা দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধাবোধ করেন।
​সৎ কর্মকর্তাদের হতাশা ও মেধা পাচার
​বীমা খাতের স্থিতিশীলতা যারা ধরে রাখতে চান, সেই দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তারা এখন চরম কোণঠাসা। এর ফলে দুটি বড় ক্ষতি হচ্ছে:
​মেধা পাচার (Brain Drain): যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তারা কাজের পরিবেশ না পেয়ে এ খাত ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
​পেশাদারিত্বের অবক্ষয়: যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব এখন ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
​আস্থা ও শিল্পের ভবিষ্যৎ অন্ধকার:
​বীমা শিল্পের মূল ভিত্তি হলো ‘বিশ্বাস’। কিন্তু সময়মতো বীমা দাবি নিষ্পত্তি না হওয়া এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে:
​সাধারণ মানুষ বীমা পলিসি গ্রহণে আগ্রহ হারাচ্ছে।
​অনিয়মকারীরা কঠোর ব্যবস্থা না পাওয়ায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
​বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বীমা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
​উত্তরণের পথ: কথার চেয়ে কাজের বাস্তবায়ন জরুরি।
​বিশেষজ্ঞদের মতে, আইডিআরএকে কেবল একটি নীতিমালা প্রণয়নকারী সংস্থা হলে চলবে না, একে একটি ‘অ্যাকশন-ওরিয়েন্টেড’ সংস্থায় রূপান্তর করতে হবে।
তাদের পরামর্শ:
​সময়াবদ্ধ বাস্তবায়ন: প্রতিটি আদেশের জন্য নির্দিষ্ট ‘ডেডলাইন’ থাকতে হবে।
​ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা: ফাইল আটকে রাখা বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গড়িমসি করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
​সুরক্ষা নিশ্চিত করা: নীতিনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের জন্য একটি ভয়হীন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে।
​উপসংহার আইডিআরএ-র কাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়লেও ‘সিদ্ধান্ত-পলায়ন’ সংস্কৃতি পুরো খাতের সম্ভাবনাকে গ্রাস করছে। বাংলাদেশের বীমা শিল্পকে শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করতে হলে এখন কথার চেয়ে কাজের প্রতিফলন এবং মেধাবীদের মূল্যায়ন নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
লেখক:- মোঃ জহির উদ্দিন
সাবেক ডিএমডি এবং সিইও (ভারপ্রাপ্ত)
প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড।