চট্টগ্রাম বন্দরে শুল্ক ফাঁকি ধরল এনবিআর

প্রকাশিত: ৭:৩৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিনিধি :

আমদানি ঘোষণায় ছিল টুথপিক, কৃষিকাজে ব্যবহৃত পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন, প্রিন্টিংয়ের হিট ট্রান্সফার পেপার কিংবা কারখানার সাধারণ স্টেইনলেস স্টিল সার্কেল। তবে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনারের সিল কেটে কায়িক পরীক্ষায় ধরা পড়ে জালিয়াতি। স্বল্পশুল্কের এসব পণ্যের আড়ালে চীন ও পাকিস্তান থেকে আনা হয়েছে কয়েক কোটি টাকার উচ্চশুল্কের পণ্য।

এছাড়া কাস্টমসের নজরদারি এড়াতে লক করা কন্টেইনারের সিল ভেঙে ভুয়া সিল লাগিয়ে পণ্য সরিয়ে নেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর অপরাধের ঘটনাও ঘটেছে।

সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এআইআর শাখার যৌথ অভিযানে এমন আটটি বড় ধরনের জালিয়াতি উন্মোচিত হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধে কাস্টমস আইন ২০২৩-এর ৩৩ ও ১৭১ ধারায় কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ঢাকার নিউ মার্কেটের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফরচুন গ্লোবাল ট্রেডিং চীন থেকে কৃষিকাজে ব্যবহৃত ১১ হাজার ৯৫৬ কেজি ওজনের পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া যায় স্টেজ লাইট, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, টুথপেস্ট, পিলিং জেল, সিরাম, বিভিন্ন ধরনের এলইডি লাইট, সানগ্লাস ও ব্ল্যাক হেয়ার শ্যাম্পু। চালানে ঘোষিত ওজনের চেয়ে প্রায় ১ হাজার ৮১৭ কেজি বেশি পণ্য ঘোষণা বহির্ভূতভাবে আমদানির মাধ্যমে প্রায় আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা চালানো হয়।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর মিথ্যা ঘোষণার প্রমাণ মিলেছে পুরান ঢাকার চকবাজারের কাফ কর্পোরেশনের একটি চালানে। চীন থেকে সাড়ে ২২ টন টুথপিক আনার ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে পাওয়া যায় মাত্র ১ হাজার ৬২০ কেজি। বাকি ১৫ দশমিক ৭ টনের পুরোটাই ছিল ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত ও বিএসটিআই নিষিদ্ধ পাকিস্তানের ‘গোরি বিউটি ক্রিম’, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, হেয়ার রিমুভার স্প্রে, প্রিমিয়াম সানগ্লাস ও যৌন উত্তেজক স্প্রে। এর মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছিল।

এছাড়া ঢাকার এইচ আর এন্টারপ্রাইজ থাইল্যান্ড থেকে ১৬ হাজার ৪০ কেজি স্বল্পশুল্কের ইঞ্জিন রাবার বুশ আমদানির ঘোষণা দেয়। কায়িক পরীক্ষায় রাবার বুশ পাওয়া যায় মাত্র ৬ হাজার ৬২৫ কেজি। প্রায় ১৩ হাজার কেজি পণ্যই ছিল উচ্চমূল্যের অরিজিনাল ইঞ্জিন মাউন্টিং, সাসপেনশন বুশ, আর্ম বুশ, সেন্টার বিয়ারিং, স্প্রিং শ্যাকল ও স্টিয়ারিংয়ের মতো দামি মোটর যন্ত্রাংশ। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি আরেকটি চালানে কমিশনারের পূর্বানুমতি ছাড়াই রাতারাতি এইচএস কোড পরিবর্তনের চেষ্টা চালায়। তবে শুল্ক গোয়েন্দাদের নজরদারিতে তারা সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছে।

একইভাবে নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স, মোহাম্মাদীয়া ট্রেড, নিউ রনি এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধেও মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ মিলেছে।

এদিকে কাফ কর্পোরেশনের আরেকটি চালানে কাস্টমসের লক ভেঙে সিল বদল করে কন্টেইনার চুরির চেষ্টা চালানো হয়। চালানটি ইয়েলো লেনভুক্ত থাকায় এবং শুল্ক ফাঁকির সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকায় সিআইসি ও এআইআর শাখা চালানটিকে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে লক করে দেয়। কিন্তু নির্ধারিত কায়িক পরীক্ষার আগেই গত ১৯ সেপ্টেম্বর কন্টেইনারটি অবৈধভাবে ‘কিপ ডাউন’ করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের প্রতিনিধিরা। এরপর বিল অব লেডিংয়ে থাকা মূল সিল ভেঙে সেখানে অন্য একটি সিল লাগিয়ে দেওয়া হয়।

নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বদলি হয়ে যাওয়া কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে কন্টেইনারটি বন্দর থেকে বের করে নেওয়ার চেষ্টা চলছিল। ঘটনাটি নজরে আসতেই কন্টেইনারটি জব্দ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।