পদ্মা ইসলামী লাইফের অভিনব প্রতারনা

প্রকাশিত: ৭:১০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১০, ২০২৫

বিশেষ প্রতিনিধিঃ লাগামহীন অনিয়ম দুর্নীতিতে সৃষ্ট আর্থিক সংকটে পড়ে গ্রাহকের বীমা দাবী পরিশোধে ব্যর্থ পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এখন অভিনব প্রতারনা করছে দেশের উচ্চ শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে চাকরি দেয়ার প্রলভন দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা চাকরি প্রত্যাশীদের কাছ থেকে। এ ধরনের প্রতারিতদের কয়েকজন অতিসম্প্রতি বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করে প্রতিকার চেয়েছেন।

এ ধরনের অনিয়মে প্রতিষ্ঠানটির পদস্থ নির্বাহী কর্মকর্তারা নিজেদের ধরাছোয়াড় বাইরে রেখে অধস্তন কর্মকর্তাদের কাঁধে দোষ চাপিয়ে নিজেদের ধোয়া তুলসির পাতা বলে চালিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন।

এ ধরনের নারী চাকরি প্রত্যাশীদের কেউ কেউ শারীরিক লাঞ্চিত হবারও অভিযোগ উঠেছে।

পদ্মা ইসলামী লাইফের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতিসম্প্রতি চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারনার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ করেছেন ভূক্তভোগি তিন জন চাকরি প্রত্যাশী। নিগার সুলতানা, শাহানাজ পারভীন ও নদীয়া আক্তার নামে তিন জন চাকরি প্রত্যাশী গত ৭ ও ৮ ডিসেম্বর বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ড. আসলাম আলম বরাবর লিখিত এই অভিযোগ করেন।

অভিযোগ পত্রে এ ঘটনার তদন্ত করে দায়িদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন এবং তাদের টাকা আদায় করে দিতে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বীমা কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক সম্মানসহ এমএ ডিগ্রিধারী জনৈক নিগার সুলতানা নামের অভিযোগকারিনী তার অভিযোগ পত্রে বলেন, ”সম্ভব অ্যাপস” নামের একটি অ্যাপলিকেশনের মাধ্যমে একটি চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে তিনি পদ্মা ইসলামী লাইফ কর্তৃপক্ষ বরাবর চাকরির আবেন করেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বিজ্ঞাপনদাতার নাম ছিল কোম্পানির ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাজ্জাদ হোসেন। নিগার সুলতানা প্রথমে সরাসরি সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে দেখা করে কথা বলেন এবং পরবর্তীতে তার পরামর্শ অনুযায়ি কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার মো. জিল্লুর রহমানের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় কোম্পানির ব্রাঞ্চ ম্যানেজার পদে মাসিক ৪০ হাজার টাকা বেতনে তাকে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। তবে এই চাকরি দেয়ার বিনিময়ে তার কাছে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা উৎকস দাবী করা হয়। আলোচনা সাপেক্ষে কয়েক দিনের সময় নিয়ে তিনি জিল্লুর রহমানকে ২ লাখ ৩২ হাজার টাকা দেন। তিনি নিয়মিত অফিসে আসতে থাকেন এবং তাকে বসার জন্য চেয়ার টেবিলও দেখিয়ে দেয়া হয়। তিনি নিয়োগ পত্র চান। নিয়োগ পত্র না দিয়ে দেই দিচ্ছি বলে কালক্ষেপন করা হয়। কিছুদিন পর তাকে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫ শত ৩০ টাকার একটি বীমা পত্র (পলিসি নং পিএএ-ই-১৪২৩-২৫) এবং ৪১ হাজার ২৭৫ টাকার অপর একটি বীমা পত্র ( পলিসি নং- পিএএ-ই-১১৯০-২৫) ধরিয়ে দেয়া হয়। তাকে পলিসিটি চালিয়ে যাবার পরমর্শ দেয়া হয়।

এই পলিসি পাবার পর তিনি তার নিয়োগ পত্র চাইলে জিল্লুর রহমান তাকে বলেন, আপনাকে কমিশন ভিত্তিতে চাকরি দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিয়োগ পত্র দরকার হবে না। আপনি ব্যবসা আনলে কমিশন পাবেন। আপনাকে প্রতিমাসে ১০ লক্ষ টাকার ব্যবসা দিতে হবে। টার্গেট পূরন না হলে কমিশনও পাবেন না। এ কথা শুনে তিনি হতবাক হয়ে যান এবং বলেন চাকরি লাগবে না, আমার কাছ থেকে নেয়া টাকা ফেরিয়ে দেন। তাকে বলা হয়, আপনার টাকা দিয়ে বীমা করে দেয়া হয়েছে, আপনি প্রতি বছরে বীমা কিস্তির টাকা নিয়মিত পরিশোধ করবেন।

নিগার সুলতানা অভিযোগ পত্রে বলেন চাকরির জন্য আমি পদ্মা লাইফে যেয়ে প্রতারিত হয়েছি। আমি বেকার। আমার কোন আয় উর্পাজন নেই। আমি নিজে চলতে পারি না। আমি কি ভাবে পলিসির এতো টাকা কিস্তি দিব। তিনি বলেন তাদের কথায় বিশ্বাস করে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার দেনা করে এনে এই টাকা দিয়েছি। এখন আমার কি হবে। তিনি টাকা ফেরত পেতে বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সহযোগিতা কামনা করেছেন এবং এ ধরনের প্রতারনা করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানিয়েছেন।

শাহানাজ পারভীন নামের অপর একজন ভূক্তভোগি গত ৭ ডিসেম্বর বীমা কর্তৃপক্ষের কাছে একই বীমা কোম্পানির একই বীমা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুরূপ অভিযোগ করেছেন। শাহানাজ তার অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করেন, তাকেও মাসিক ৪০ হাজার টাকা বেতনে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার পদে চাকরি দেয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। চাকরির কোন নিয়োগ পত্র না দিয়ে কিছুদিন পরে উক্ত টাকার একটি বীমা পত্র ধরিয়ে দেয়া হয়। তিনি এখন চাকরি নয়, টাকা ফেরত চান।

নদীয়া আক্তার নামে আরও একজন ভূক্তভোগি গত ৮ ডিসেম্বর বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ড. আসলাম আলম বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগ পত্রে তিনি বলেন, তাকে ৩০ হাজার টাকা মাসিক বেতনে ইউনিট ম্যানেজার পদে চাকরি দেয়ার কথা বলে তার কাছে টাকা চাওয়া হয়। তিনি চাকরি হবে মর্মে ধার দেনা করে জেনারেল ম্যানেজার জিল্লুর রহমানকে ২২ হাজার ২৬০ টাকা দেন। তাকে কোন নিয়োগ পত্র না দিয়ে বীমা পলিসি বাবদ ২০ হাজার টাকার একটি মানিরিসিট ধরিয়ে দিয়ে বলেন, প্রতি মাসে ২ লাখ টাকার ব্যবসা দিতে পারলে কশিশন পাবেন। টার্গেট পূরন না হলে কোন টাকা পাবেন না। তিনি প্রতারনার অভিযোগ করেছেন বীমা কর্তৃপক্ষের কাছে।

এ সব অভিযোগ সম্পর্কে অর্থবিজ এর পক্ষ থেকে কোম্পানিটির ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাজ্জাদ হোসেন এবং জেনারেল ম্যানেজার জিল্লুর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে পৃথক ভাবে কথা বলা হয়। ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাজ্জাদ হোসেন অভিযোগের বিষয়ে বলেন, তার সঙ্গে অভিযোগকারিদের একজনেরও কোন আর্থিক লেনদেন হয়নি। তবে জেনারেল ম্যানেজার জিল্লুর রহমানের সঙ্গে কিছু ঝামেলার কথা শুনেছি। ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাজ্জাদ হোসেন বলেন, কোন আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকলে তা হয়েছে জেনারেল ম্যানেজার জিল্লুর রহমানের সাথে । এই মেয়েদের সঙ্গে তার কিছু ঝামেলা হয়েছে। বিষয়টি অফিস দেখছে।

এ বিষয়ে জেনারেল ম্যানেজার জিল্লুর রহমান অর্থবিজকে বলেন, তাদের অভিযোগটি সত্য নয়। তাদের সঙ্গে আমার কোন একটা বিষয়ে ভুল বোজাবুঝি হয়েছিল, সেটা এখন মিটে গেছে। তিনি বলেন আমি এখন এ কোম্পানিতে নেই। চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। তবে অভিযোগকারিগন বলেছেন, তার দাবী সত্য নয়। আমরা টাকা দিয়েছি,তার কিছু প্রমানও আছে।

নিগার সুলতানা বলেছেন টাকাটার কিছু পরিমান সাজ্জাদ হোসেনের মোবাইল নম্বরে এবং বাকি টাকাটা জিল্লুর রহমানের মোবাইল নম্বরে বিকাশ করে দেয়া হয়েছে। তবে শাহানাজ পারভিন বলেছেন তিনি দেড় লাখ টাকা জিল্লুর রহমানের হাতে ক্যাশ দিয়েছেন। নদীয়া আক্তারও জিল্লুর রহমানকে ক্যাশ টাকা দিয়েছেন।

খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, বিগত সরকারের সময় এই বীমা কোম্পানিটি এস আলম গ্রুপের কব্জায় চলে যায়। প্রভাব বিস্তার করে এস আলম এই বীমা কোম্পানিটি দখলে নিয়ে নিজের আস্থাভাজন লোকদের বসান। আগের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে দিয়ে নিজের লোকদের দিয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। এই বোর্ডের চেয়ারম্যান করা ফখরুল ইসলামকে। তবে এতে কোম্পানিটির বীমা গ্রাহকদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। কোম্পানিটির বিপুল সংখ্যক গ্রাহক বীমা দাবী পাচ্ছে না। কোম্পানিটি লুটে পুটে খেয়ে সব শেষ করে দিয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিটির কর্মকর্তা কর্মচারিরা ঠিকমতো বেতন ভাতাও পান না। মাঠ পর্যায় থেকে যা কিছু প্রথম বর্ষ ও নবায়ন প্রিমিয়ামের টাকা আসে, তা দিয়ে কোন ভাবে কোম্পানিটিকে ধরে রাখা হচ্ছে। এখন এ কোম্পানির বীমা করে গ্রাহকদের প্রতারিত হবার যথেষ্ট আশংকা রয়েছে।

এ অবস্থায়ও না জেনে না বুঝে চাকরি নিতে এসে আবার অনেকে প্রতারিত হচ্ছেন। এর দায় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বিশেষ করে বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এড়িয়ে চলতে পারেন না বলে খাত সংশ্লিষ্টরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

এ বিষয়ে কথা বলতে পদ্মা ইসলামী লাইফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোরর্শেদ আলম সিদ্দিকির মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তার কোন সাড়া মিলে নাই