বীমা খাতে দাবিপরিশোধের সংকট চরমে: গ্রাহকদের ৭,৭৭৮ কোটি টাকা আটকে

প্রকাশিত: ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০২৬

নুরনবী সোহেল, বিশেষ প্রতিবেদনঃ দেশের বীমা খাতে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে জীবন ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে গ্রাহকদের মোট ৭ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে।

এর মধ্যে এককভাবে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের কাছেই আটকে আছে ৩ হাজার ৩১০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা মোট বকেয়া দাবির প্রায় ৪৩ শতাংশ। ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা ও গ্রাহকসেবা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি–মার্চ) সময়ের অনিরীক্ষিত দাবিসংক্রান্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি বীমা কোম্পানির আর্থিক দুর্বলতা, সুশাসনের ঘাটতি, দুর্বল করপোরেট ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকির অভাবে গ্রাহকদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন পুরোনো গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করাও দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে দেশের ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানির মোট দাবির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮১২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে কোম্পানিগুলো পরিশোধ করেছে মাত্র ২ হাজার ৪০২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ফলে জীবন বীমা খাতেই ৪ হাজার ৪১০ কোটি ১২ লাখ টাকার দাবি এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে।

অন্যদিকে ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানির অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ ৩ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। জীবন ও সাধারণ বীমা—দুই খাত মিলিয়ে মোট বকেয়া দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা, যা দেশের বীমা শিল্পের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফের অবস্থাই সবচেয়ে সংকটপূর্ণ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির মোট দাবির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৩৩৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে তারা পরিশোধ করতে পেরেছে মাত্র ২৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ফলে ৩ হাজার ৩১০ কোটি ৪৩ লাখ টাকার দাবি এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে, যা এককভাবে দেশের বীমা খাতের সবচেয়ে বড় বকেয়া।

জীবন বীমা খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বকেয়া দাবি
ফারইস্ট ইসলামী লাইফের পর জীবন বীমা খাতের অন্যান্য কোম্পানির মধ্যেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। এর মধ্যে—
সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স : ২০৮ কোটি ৯ লাখ টাকা
প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স : ১৫৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা
জীবন বীমা করপোরেশন (জেবিসি) : ৬৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা
মেটলাইফ বাংলাদেশ : ৬০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা
ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স : ৫৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা
গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স : ৫৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা
সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স : ৩৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা
হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স : ৩৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা

এসব প্রতিষ্ঠানের বকেয়া দাবি প্রমাণ করে যে, জীবন বীমা খাতে দাবিপরিশোধের সমস্যা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়; এটি একটি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হয়েছে।

সাধারণ বীমা খাতেও উদ্বেগ
সাধারণ বীমা খাতেও পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। মোট ৩ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকার অনিষ্পন্ন দাবির মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা করপোরেশনের অংশই ১ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা।
এছাড়া উল্লেখযোগ্য বকেয়া রয়েছে—
গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স : ৩১৪ কোটি টাকা
প্রগতি ইন্স্যুরেন্স : ১৭৫ কোটি টাকা
রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স : ১৪৬ কোটি টাকা

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বড় অঙ্কের এসব বকেয়া দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

আস্থার সংকটে পুরো বীমা শিল্প
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের দাবিপরিশোধে ব্যর্থতা পুরো বীমা খাতের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অনেক গ্রাহক মেয়াদপূর্তির পর বছরের পর বছর দাবি আদায়ের জন্য অপেক্ষা করছেন। ফলে বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমছে এবং নতুন গ্রাহক সংগ্রহে কোম্পানিগুলো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, “বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে (আইডিআরএ) আরও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে হবে। কেবল নির্দেশনা দিলেই হবে না, বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, “যেসব কোম্পানি নিয়মিত দাবিপরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না।”

আইডিআরএর পদক্ষেপ
এ বিষয়ে আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বকেয়া দাবিপরিশোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। দুর্বল কোম্পানিগুলোর সম্পদ নগদায়ন, কমিশন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার এবং আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, ভালো ব্যাংকে থাকা স্থায়ী আমানত, সরকারি ট্রেজারি বন্ড, বিক্রিযোগ্য জমি ও অন্যান্য বিনিয়োগ নগদায়নের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর দাবিপরিশোধের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে আটকে থাকা আমানতের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে।

এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বীমা খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল নতুন নীতিমালা প্রণয়ন বা নির্দেশনা জারি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকের দাবি পরিশোধে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং গ্রাহকদের ন্যায্য পাওনা দ্রুত পরিশোধ নিশ্চিত করাই এখন আইডিআরএর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা, সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং সময়মতো দাবিপরিশোধ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। অন্যথায় দেশের বীমা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন এবং জনগণের মধ্যে বীমা সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়বে।