সানলাইফে ৩৯ কোটি টাকার বকেয়া প্রিমিয়াম, ধুঁকছে গ্রাহক

প্রকাশিত: ৭:৪০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

ফারজানা ফারাবী : ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে নবায়ন প্রিমিয়াম আয় ছিল ৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে হয়েছে ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা—কমেছে ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ।

প্রথম বর্ষের প্রিমিয়ামও কমেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে এ খাতে আয় ছিল ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, যা চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে নেমে এসেছে ৯৪ লাখ টাকায়। অর্থাৎ কমেছে প্রায় ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটির মোট গ্রস প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ৫ কোটি ৮৩ লাখ ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।

আয়ের বিপরীতে ব্যয়ের চাপও কমেনি। প্রথম ছয় মাসে ৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের বিপরীতে কমিশন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট প্রিমিয়াম আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ (৮১.৯১%) চলে গেছে কমিশন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে।

এতে নতুন ব্যবসা ও নবায়ন প্রিমিয়াম—দুই ক্ষেত্রেই আয় কমার সময় কোম্পানির ব্যয় কাঠামোর ওপর চাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে।

সানলাইফের ব্যাংকনির্ভরতার চিত্রও বদলেছে দ্রুত। ২০২৪ সালে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে কোম্পানিটির ওভারড্রাফট ছিল ১ কোটি ৭৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা। ২০২৫ সালের শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ কোটি ৭০ লাখ ১০ হাজার টাকা—এক বছরে বেড়েছে ৪৪৪ দশমিক ১৩ শতাংশ।

ব্যাংক ওভারড্রাফট হলো ব্যাংকের এমন একটি ঋণসুবিধা, যেখানে গ্রাহক নিজের ব্যাংক হিসাবে থাকা টাকার চেয়ে বেশি টাকা তুলতে পারেন, নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত।

ঋণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সুদ ব্যয়ও। ২০২৪ সালে যেখানে সুদ ব্যয় ছিল ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ২১ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরে সুদ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬৩ গুণ।

চলতি বছরের জুন শেষে ওভারড্রাফট আরও বেড়ে ১০ কোটি ৩ লাখ ১২ হাজার ৮৯৯ টাকায় পৌঁছেছে।

কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক লাইফ ফান্ডও কমেছে। ২০২৫ সালের শেষে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে লাইফ ফান্ডের পরিমাণ ৫৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা দেখানো হয়। ছয় মাস পর তা কমে হয়েছে ৪৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা—অর্থাৎ কমেছে ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

তবে আইডিআরএর বার্ষিক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের লাইফ ফান্ডের পরিমাণ ৪৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। একই বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে ৫৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা উল্লেখ থাকায় দুই নথির মধ্যে এই পার্থক্যের ব্যাখ্যাও প্রয়োজন।

২০২৪ সালে সানলাইফের শেয়ার ও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ ছিল ২০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়ায় ১৮ কোটি ৮১ লাখ টাকায়। তবে ২০২৬ সালের জুনে শেয়ারের পুনর্মূল্যায়ন ও অতালিকাভুক্ত শেয়ার অন্তর্ভুক্তির পর তা বেড়ে ৩২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।

অন্যদিকে, কোম্পানিটির ১৬ কোটি ৯০ লাখ ৫১ হাজার টাকার পুঁজিবাজার বিনিয়োগের মূল্যায়ন নিয়েও নিরীক্ষকের প্রশ্ন রয়েছে। নিরীক্ষকের Emphasis of Matter-এ বলা হয়েছে, এসব বিনিয়োগ আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড (IFRS) অনুযায়ী ন্যায্য মূল্যে দেখানো হয়নি; বরং ক্রয়মূল্যে দেখানো হয়েছে।

সানলাইফের ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণী নিয়ে নিরীক্ষক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলাদা করে উল্লেখ করেছেন।

প্রথমত, ১২ কোটি ১৩ লাখ টাকার স্থায়ী সম্পদের পূর্ণাঙ্গ ফিক্সড অ্যাসেট রেজিস্টার পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয়ত, আয়কর আইন ২০২৩ ও IAS 12 অনুযায়ী চলতি ও স্থগিত করের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্থান করা হয়নি। তৃতীয়ত, ১৬ কোটি ৯০ লাখ ৫১ হাজার টাকার পুঁজিবাজার বিনিয়োগের মূল্যায়ন IFRS 9 ও IFRS 13 অনুযায়ী ন্যায্য মূল্যে করা হয়নি।

এসব পর্যবেক্ষণ কোম্পানিটির হিসাবরক্ষণ ও আর্থিক প্রতিবেদনের মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সানলাইফের পুরোনো হিসাবের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডকে দেওয়া ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকার অগ্রিম।

কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, বিডি থাই ফুডের শেয়ার কেনার জন্য সানলাইফ ১২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা পেয়েছিল এবং এর বিপরীতে ১১ কোটি টাকার শেয়ার ইস্যু করা হয়। তবে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা অগ্রিম হিসেবে থেকে গেছে। এ অর্থের পক্ষে বৈধ ভাউচার ও প্রয়োজনীয় সহায়ক নথির ঘাটতির কথাও কোম্পানির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সানলাইফের উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিত শেয়ারধারণ ৩৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে কমে ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ হয়েছে।

এ সময়ে গ্রিন ডেল্টা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান জিডি অ্যাসিস্ট লিমিটেড তাদের ৬ শতাংশ শেয়ার বা ২১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪৫টি শেয়ার বিক্রি করে পুরোপুরি বেরিয়ে গেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারধারণ শূন্যে নেমেছে। একই সময়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারধারণ ৫৪ দশমিক ৬২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ হয়েছে।

শেয়ার বিক্রির পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ কোম্পানির তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।