মালিকানা দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স লক্ষ লক্ষ গ্রাহকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

প্রকাশিত: ৬:৪৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬

শেখ মনিরুল ইসলাম, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার :

মালিকানা দ্বন্দ্ব, পরিচালনা পর্ষদের প্রকাশ্য গ্রুপিং, একাধিক মামলা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে সংকটে পড়েছে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি কার্যত দেউলিয়াত্বের ঝুঁকিতে রয়েছে, যা লাখো গ্রাহকের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ সরকারের লাইসেন্সপ্রাপ্ত এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও সম্প্রতি মালিকপক্ষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিচালনা পর্ষদে বর্তমানে ১১ জন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে কথিত “সিলেট গ্রুপ”-এর নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন এবং “ঢাকা গ্রুপ”-এর নেতৃত্বে মোহাম্মাদ জুলহাস। উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে দুদকসহ একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক চিত্রও উদ্বেগজনক। বর্তমানে লাইফ ফান্ডে রয়েছে ১৮ কোটি টাকা এবং এফডিআর হিসেবে ব্যাংকে জমা আছে ৪১ কোটি টাকা—মোট ৫৯ কোটি টাকা সম্পদ। এছাড়া কুমিল্লায় একটি প্লট এবং ঢাকার একটি গ্যারেজে ৪১টি গাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে গ্রাহকদের মোট দায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫৬ কোটি টাকা। ভ্যাট ও ট্যাক্স বাবদ বকেয়া রয়েছে ১১৯ কোটি টাকা। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার ১৪ মাসের বেতন বকেয়া এবং দেশের বিভিন্ন শাখা অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায় ৪ কোটি টাকা বেতন বকেয়া রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের মোট দায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭৯ কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, ব্যাংকে জমাকৃত ৪১ কোটি টাকার এফডিআর থেকে মাসে প্রায় ৪৬ লাখ টাকা সুদ আয় হয়। এর মধ্যে প্রধান কার্যালয়ের ভাড়া, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য ব্যয় মিলে প্রায় ৩৩ লাখ টাকা খরচ হয়। অবশিষ্ট প্রায় ১৩ লাখ টাকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মালিকপক্ষ ও প্রশাসনিক সিন্ডিকেট বিভিন্ন কৌশলে এই অর্থ আত্মসাৎ করছে।

এদিকে হাইকোর্টের এক রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এবং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তক্রমে প্রতিষ্ঠানের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাকে স্বাক্ষর প্রদান থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এই পরিস্থিতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত অবসরপ্রাপ্ত বিচারককে বিভ্রান্ত করে ব্যাংকে জমাকৃত ৪১ কোটি টাকার এফডিআর ভাঙার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকিং লেনদেন বন্ধ থাকার সুযোগে ডিএমডি জাকির হোসেনের নেতৃত্বে সাবেক চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন ও সেক্রেটারি শহিদুল ইসলামসহ একটি চক্র দেশের বিভিন্ন শাখা অফিস ও গ্রাহক-কর্মীদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা উত্তোলন করে ভাগবাটোয়ারা করেছে।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ঈদের আগেই ৪১ কোটি টাকার এফডিআর ভাঙার প্রক্রিয়া দ্রুততর করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, এফডিআর ভেঙে ফেললে অফিস ভাড়া ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের মতো ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতাও থাকবে না।

গ্রাহক, কর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ উত্তোলন করা হলে তা যেন কেবল গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বণ্টন করা হয় এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা অবিলম্বে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।