যমুনা লাইফ ইন্সুরেন্সের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সিইও ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত দাবি

প্রকাশিত: ৩:৩৫ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৪, ২০২৫

নিজস্ব প্রতিবেদক:

যমুনা লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, প্রশাসনিক অপব্যবহার ও নৈতিক বিচ্যুতির অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত একাধিক অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র কোম্পানির ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সূত্র জানায়, বীমা নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইডিআরএ’র (IDRA) নির্দেশে স্থায়ী সিইও নিয়োগে জটিলতা দেখা দিলে কর্তৃপক্ষ ফরিদুল আলমকে অস্থায়ীভাবে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেয়। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ও অসন্তোষ দেখা দেয়। পরবর্তীতে নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি গত ১২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন।

প্রশাসনিক বিভাজন ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, দায়িত্ব পালনকালে ফরিদুল আলম কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে দলীয়করণ ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। তার বিরুদ্ধে অবৈধ আর্থিক সুবিধা আদায়, কর্মীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ এবং প্রতিষ্ঠানীয় হিসাবের বাইরে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা রাখার অভিযোগ রয়েছে।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, নতুন সংগঠন গঠন ও প্রণোদনা প্রদানের নামে তিনি লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া কক্সবাজার বার্ষিক সম্মেলনের ক্ষেত্রে যোগ্য কর্মকর্তা উপস্থিত না থাকলেও তাদের নামে ভাতা ও ভ্রমণ ব্যয়ের অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করার অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।

ব্যবসায়িক স্থবিরতা সত্ত্বেও অস্বাভাবিক ব্যয়

যমুনা লাইফে প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেলেও ফরিদুল আলমের সময়ে অফিস ভাড়া, কর্মচারী বেতন, পরিবহন খরচ ও প্রশাসনিক ব্যয়ে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়।
প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কোম্পানির আয়ে পতন ঘটলেও নির্বাহী স্তরে বিলাসিতা ও অতিরিক্ত ব্যয় প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে।

নারী সহকর্মীদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে প্রশ্ন?

দায়িত্ব পালনকালে ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে নারী সহকর্মীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক ও অফিসের শৃঙ্খলাবিরোধী আচরণের অভিযোগ একাধিকবার উত্থাপিত হয়। একটি অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রংপুর সফরের সময় তিনি জয়পুরহাট অঞ্চলের এক নারী কর্মকর্তার সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ও প্রশাসনিক সীমালঙ্ঘনের ঘটনা ঘটান। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক ও পারিবারিক চাপে তিনি ওই নারীকে বিয়ে করেন বলে জানা গেছে। এ ধরনের আচরণ প্রতিষ্ঠানটির নীতি-নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে বলে মনে করেন একাধিক কর্মকর্তা।

পূর্বের কর্মস্থলগুলিতেও অনিয়মের অভিযোগ

প্রাপ্ত নথিপত্র অনুযায়ী, ফরিদুল আলম পূর্বে সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্সুরেন্স, হোমল্যান্ড লাইফ ইন্সুরেন্স ও গোল্ডেন লাইফ ইন্সুরেন্সে দায়িত্ব পালনকালে একাধিক অভিযোগের মুখে পড়েছিলেন। সেই সময়ও তার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অনিয়ম, নারী সহকর্মীদের সঙ্গে সীমালঙ্ঘনমূলক সম্পর্ক এবং প্রশাসনিক অসদাচরণের অভিযোগে অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয় এবং পরবর্তীতে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অব্যাহতি নেন। এই নথিগুলো বর্তমানে বীমা নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নজরে রয়েছে বলে জানা গেছে।

বীমা খাতের ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ

বীমা খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ধরনের প্রশাসনিক আচরণ ও নৈতিক সংকট পুরো শিল্পখাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একজন কর্মকর্তা বলেন,
“যমুনা লাইফ একসময় একটি সুশৃঙ্খল ও সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কিছু সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের কারণে প্রতিষ্ঠানটি কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।”

তারা আরও জানান, ফরিদুল আলমের দায়িত্বকালীন সময়ের আর্থিক লেনদেন, ব্যয় ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম আর না ঘটে।

উপসংহার

বর্তমানে ফরিদুল আলম যমুনা লাইফ ইন্সুরেন্সে কর্মরত নন। তবে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও প্রশাসনিক মূল্যায়নের দাবি উঠেছে। আইডিআরএ ও প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ জানিয়েছে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা ও সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। বীমা খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পেশাদার নৈতিকতা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এই ধরনের অনুসন্ধানমূলক ব্যবস্থা শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।