ইমেজ সংকটে সোনালী লাইফ ব্যবসায় ধস মূলে পারিবারিক দ্বন্দ্ব

প্রকাশিত: ৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ, মে ১৩, ২০২৪

বিশেষ প্রতিনিধিঃ জায়গা ক্রয়ের অনুমোদন চেয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কাছে আবেদন করেন গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর। কিন্তু এ আবেদনে অনুমোদন দেয়নি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। কোনো রকমের বিনিয়োগ ছাড়াই চেয়ারম্যান হওয়া, পরিবারের সদস্যদের পরিচালক বানানো এবং ফ্লোর ক্রয়ের অনুমোদনের আগেই কোম্পানির তহবিল থেকে অর্থ নেওয়াসহ বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এ নিরীক্ষক নিয়োগ করে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইডিআরএ। ৩১ ডিসেম্বর নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান হুদাভাসী চৌধুরী এন্ড কোম্পানীকে নিরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সোনালী লাইফের ১৭টি বিষয়ে ৩০ দিনের মধ্যে নিরীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নিরীক্ষককে নির্দেশ দেয় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। সে নির্দেশ অনুযায়ি নিরীক্ষায় সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর আর্থিক অনিয়ম সত্যতা প্রমাণিত হয়। ১৮ জানুয়ারি কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড পর্ষদের জরুরি বৈঠকে নিরপেক্ষ পরিচালক কাজী মনিরুজ্জামানকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।

সোনালী লাইফের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় মীর রাশেদ বিন আমানের দুর্নীতি ধরা পড়ে বলে শ্বশুর মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস দাবি করেন। সে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রাশেদ আমানকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর ভাইস চেয়ারম্যান মীর রাশেদ বিন আমানের স্ত্রী এবং তার পুত্র সন্তানদ্বয়ের মাতা ফাউজিয়া কামরুন তানিয়া স্বাক্ষরিত এক খবর বিজ্ঞপ্তিতে তা জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগে বলা হয়, অস্ট্রেলিয়া থেকে পড়াশোনা শেষ করে এসে মীর রাশেদ বিন আমান শ্বশুরের প্রতিষ্ঠিত সোনালী লাইফের সিইও পদে বসেন। এরপর এই পদ ব্যবহার করে দুর্নীতি, নানা অনিয়ম ও নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সোনালী লাইফের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় প্রকাশ পেয়েছে এসব ঘটনা, কোম্পানির তহবিল থেকে ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। কর্মচারীদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে করপোরেট রেকর্ড হেরফের করার মতো গুরুতর অভিযোগও পাওয়া গেছে।
কোম্পানির পক্ষ থেকে রাশেদ বিন আমান ও তার দুর্নীতির সহযোগীদের বিরুদ্ধে ৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়। সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর কর্মকর্তা মোস্তফা গোলাম এমরান বাদী হয়ে মহানগরীর রামপুরা থানায় মামলাটি দায়ের করেন। এতে মীর রাশেদ বিন আমানসহ কোম্পানির সাবেক সাত কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক বিশ্বাসভঙ্গ করে অর্থ আত্মসাৎসহ হুমকি প্রদানের অপরাধে ১৮৬০ এবং দন্ডবিধির ৪০৮/৪২০/৫০৬ ধারায় মামলা দায়ের (মামলা নং-৪ তারিখ -১১/০১/২০২৪)। অভিযুক্ত আসামিরা হলেন, মীর রাশেদ বিন আমান, সোনালী লাইফের সাবেক পলিসি সার্ভিসের কর্মকর্তা ফাতেমা তামান্না সুইটি, হিসাব বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা সুমি সেন, প্রশাসন বিভাগের সাবেক ডিজিএম রাজেশ আইচ, সাবেক হেড অব ফাইন্যান্স মো. বোরহান উদ্দিন মজুমদার, হিসাব বিভাগের সাবেক ম্যানেজার মো. শিপন ভূঁইয়া ও সাবেক হেড অব ইনভেস্টমেন্ট সুজন তালুকদার। আসামীরা জামিনে রয়েছেন।

মীর রাশেদ বিন আমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি কোম্পানি থেকে পাওয়া মাসে সাড়ে চার লাখ টাকা বেতনের বাইরে ব্যবহার করেছেন একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি। দ্বিতীয় স্ত্রী ফাতেমা তামান্না সুইটিকে ঢাকায় কিনে দিয়েছেন বিলাসী ফ্ল্যাট ও দামি গাড়ি। এমনকি অর্থ পাচারের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় চারটি অ্যার্পাটমেন্ট ও মার্সিডিজ জি ওয়াগন-২০২১ মডেলের দামি গাড়ি কিনেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। সোনালী লাইফের বরখাস্ত হওয়া মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (চঃ দাঃ) মীর রাশেদ বিন আমানের বিরুদ্ধে কোম্পানির প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায় আগেই। তার জমা দেয়া শিক্ষা সনদ ও অভিজ্ঞতা সনদও ভূয়া বলে অভিযোগ রয়েছে। রাশেদ অস্ট্রেলিয়ার ‘ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনি‘র স্নাতকোত্তর (এমবিএ) সনদ নিজেই বানিয়ে নিয়েছিলেন। তৈরি করেছেন মেঘনা লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর নামে একটি ভূয়া অভিজ্ঞতা সনদও। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে তিনি এ দুই ভূয়া সনদই জমা দিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ৪ মার্চ মীর রাশেদ বিন আমানের সনদের সত্যতার বিষয়ে জানতে চেয়ে সোনালী লাইফ থেকে ইমেইল পাঠানো হয়। ১৫ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়টির পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাশেদের বিবিএ সনদটি সঠিক হলেও এমবিএ সনদটি ভূয়া। সনদ জালিয়াতি ও কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় রাশেদের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করেছে সোনালী লাইফ। কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা নাঈমুর রহমান ২২ মার্চ বাদী হয়ে রাজধানীর রামপুরা থানায় মামলাটি করেন।

জানা গেছে, বীমা খাতে ডেলটা লাইফ ও ফারইস্ট ইসলামী লাইফের পর ইমেজ সংকটে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের পদস্থ কর্মকর্তাদের বোলচাল ছিল ‘ফলো দ্যা সোনালী।‘ বীমা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এখন আইডিআরএ‘র কর্মকর্তাগণ কাউকে তা বলেন না।
লাইফ বিষয়ে যুক্ত আইডিআরএ‘র পদস্থ একজন কর্মকর্তার সঙ্গে অর্থকাগজ থেকে যোগাযোগ করা হয়। মুখ বন্ধের সংকেত দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন সোনালী লাইফের ব্যাপারে কোন কথা বলা যাবে না!
পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর পরিচালনা পর্ষদ স্থগিত করে অতি সম্প্রতি নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। গত ১৮ এপ্রিল আইডিআরএ পরিচালক (আইন) মোহাম্মদ আব্দুল মজিদের সই করা এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়। নির্দেশনায় বলা হয়, বীমা আইন ২০১০ এর ধারা-৯৫(১) এর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর বিদ্যমান পরিচালনা পর্ষদকে ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হলো। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীনে বীমাকারীর কার্যক্রম ব্যবস্থাপনার জন্য ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) এস এম ফেরদৌস, এনডিসি, পিএসসিকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করা হলো। সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর পক্ষ থেকে এ নিদের্শের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রীট করা হলে রায়ে প্রশাসক নিয়োগ ও পর্ষদ বিষয়ক স্থগিতাদেশ বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
জানা গেছে, ২৯ এপ্রিল থেকে প্রশাসক এস এম ফেরদৌস সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে নিয়মিত বসছেন। এদিকে হুদাাভাসী চৌধুরী এন্ড কোম্পানীর নিরীক্ষা প্রতিবেদন পছন্দ হয়নি সোনালী লাইফের। কোম্পানির পক্ষ থেকে তাই উত্থাপিত সকল অভিযোগ ও অনিয়ম পুনরায় যাচাইপূর্বক আরেকটি নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এর কাছে আবেদন করা হয়। কয়েকদিনের মধ্যে নতুন নিরীক্ষক এসে কাজ শুরু করবে। বিগত প্রায় ৬ মাসে সোনালী লাইফের অভ্যন্তরে অনিয়ম এবং অনাভিপ্রেত ঘটনায় তদন্ত ও নিরীক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিভিন্ন গোয়েন্দা বিভাগ যুক্ত হয়েছে।

সোনালী লাইফের দাবী ও পাওনাদারদের টাকা পরিশোধ স্থগিত রয়েছে। বিশ্বাসযোগ্য কর্মকর্তা বা পরিচালক না থাকায় আইডিআরএ গত ২৩ এপ্রিল থেকে পাওনা পরিশোধ বন্ধ রেখেছে। জানা গেছে, প্রায় ১০ কোটি টাকার বীমা দাবী অপরিশোধিত অবস্থায় রয়েছে। ৭ দিনের মধ্যে দাবী নিষ্পন্ন না হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে উৎকন্ঠা কাজ করছে। দাবী যথাসময়ে পরিশোধ না করা, নকল শিক্ষা সনদ দিয়ে মুখ্য নির্বাহী পদে চাকরি, তহবিল তসরূপ, মালিকানা দ্বন্দ্ব, অনিয়ম দুর্নীতি এবং গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণার মতো একাধিক ঘটনার কারণে দেশী জীবন বীমা কোম্পানির প্রতি সঞ্চয়ী মানুষ ও বীমা গ্রাহকদের আস্থা কমে যাচ্ছে। ডেলটা, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ ও সানলাইফের পর সাম্প্রতিককালের সোনালী লাইফের পর্ষদ বনাম উর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দ্বন্দ্ব গোটা বীমা ব্যবসায়ে ইমেজ সংকট সৃষ্টি হয়েছে প্রকটভাবে।