৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ এর অভিযোগ, আলফা প্রডাক্টের ম্যানেজার অমিত হালদার গ্রেপ্তার

প্রকাশিত: ৭:৩৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২১, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজধানীর উত্তরায় ‘আলফা প্রডাক্ট’-এর ম্যানেজার (অ্যাডমিন অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস) অমিত হালদারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ অর্থ, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও স্বাক্ষরিত ব্যাংক চেক আত্মসাতের অভিযোগ ও গ্রেফতার । এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়েরের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। মামলার এজাহারে প্রাথমিকভাবে ৩ কোটি ১৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে যোগাযোগ ও হিসাব যাচাই শেষে অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘আলফা প্রডাক্ট’-এর ম্যানেজার অমিত হালদার দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর ধরে অ্যাডমিন অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস বিভাগে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লায়ন মো. সাইদুল ইসলাম গুরুতর অসুস্থতার কারণে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৩ আগস্ট ২০২৬ থাইল্যান্ডে যাওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও স্বাক্ষরিত ব্যাংক চেকবইসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি অমিত হালদারের জিম্মায় রেখে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়, গত ১২ আগস্ট সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টা ৪৫ মিনিটে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান অফিস থেকে বাসায় চলে যান। পরদিন ১৩ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে অফিসে এসে তিনি অমিত হালদারকে দেখতে না পেয়ে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তবে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

পরে অমিত হালদারের ডেস্কে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, স্বাক্ষরিত ব্যাংক চেকবই এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়। এ সময় তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বিষয়টি জানানো হলে বিভিন্ন ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে যোগাযোগ করে লেনদেনের তথ্য যাচাই করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, গত ১৩ জুলাই থেকে ১১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওনা অর্থ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে অমিত হালদার তার ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে গ্রহণ করেন।

এজাহারে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, একটি ব্যক্তিগত প্রাইম ব্যাংক পিএলসি হিসাবে ৮৮ লাখ টাকা এবং একটি ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসি হিসাবে ৩০ লাখ টাকা, অর্থাৎ ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে মোট ১ কোটি ১৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া অন্য একটি ডাচ্-বাংলা ব্যাংক হিসাবে ৩ লাখ টাকা, বিকাশ হিসাবে ৪০ হাজার টাকা, নগদ হিসাবে ৩০ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নগদে ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা গ্রহণের অভিযোগ করা হয়েছে। এভাবে এজাহারে উল্লেখিত হিসাবে মোট ১ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা নগদ ও অন্যান্য মাধ্যমে গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নগদে নেওয়া অর্থসহ মামলার এজাহারে মোট ৩ কোটি ১৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ নথি, স্বাক্ষরিত ব্যাংক চেকবই ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আরও আশঙ্কা করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক পার্টিদে কাছ থেকে লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ ও হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন হলে কথিত অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

এ ঘটনায় ‘আলফা প্রডাক্ট’-এর পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটি দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৪০৮ ধারায় দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে। মামলার নম্বর ২৭, তারিখ ১৫ আগস্ট ২০২৬ এবং স্মারক নম্বর ৭২৪৭(৫)/১, তারিখ ১৫ আগস্ট ২০২৬।

মামলার পর অমিত হালদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে তিনি আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন।

এদিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে অমিত হালদারের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে লেনদেনের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ ধারণা করছেন, এত বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন এককভাবে সংঘটিত হয়েছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে—তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

তাদের দাবি, ব্যাংক লেনদেন, চেকের ব্যবহার, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের হিসাব, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বক্তব্য এবং প্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্র নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন সম্ভব।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কি না, নাকি এর সঙ্গে আরও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র রয়েছে—সেটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে আত্মসাতের অভিযোগে উল্লেখিত অর্থের প্রকৃত পরিমাণও নিরপেক্ষ তদন্ত ও আর্থিক নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আলফা প্রোডাক্ট এর মতো একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমন ঘটনার অভিযোগে ব্যবসায়ী মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তদন্তকারী সংস্থা নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করবে এবং অভিযোগের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তদন্তে তাদের ভূমিকা স্পষ্ট হবে এবং অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট মহল।