বিশ্ব অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে নতুন সমীকরণ প্রকাশিত: ৯:২১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬ ফারজানা ফারাবী : বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে প্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অভাবনীয় উত্থান নতুন আশার সঞ্চার করেছে, অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সুদহার বৃদ্ধির কারণে বিশ্ববাজারে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটে চলমান অস্থিরতা এবং বিভিন্ন দেশের রাজকোষের ক্রমবর্ধমান বোঝা বিনিয়োগকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। প্রযুক্তি খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের ফলে সম্পদের মূল্যায়নে যে স্ফীতি দেখা দিয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তবে এতসব অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মধ্যেও বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বেশ সহনশীল প্রমাণিত হয়েছে, যা বাজারের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সম্প্রতি ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস (বিআইএস) তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে বিশ্ব অর্থনীতির নানা দিক, বিশেষ করে সুদহার বৃদ্ধি, উদীয়মান বাজার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের অস্থিতিশীলতার চিত্র বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুদহার বিশ্বজুড়েই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বন্ড মার্কেটে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার অন্যতম কারণ হলো ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা এবং সরকারি ঋণের টেকসই হওয়ার বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের সংশয়। দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুদহার এবং বন্ড মার্কেট বিশ্বজুড়ে সরকারি বন্ডের সুদহার, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ক্ষেত্রে, বেশ ঊর্ধ্বমুখী। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার প্রায় ৩১ বেসিস পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে, জার্মানির বন্ডের সুদহার ৩৪ বেসিস পয়েন্ট, জাপানের ২৭ বেসিস পয়েন্ট এবং যুক্তরাজ্যের ২৪ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে। এই বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম চালিকাশক্তি হলো ‘টার্ম প্রিমিয়াম’ বা দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ধরে রাখার জন্য বিনিয়োগকারীদের দাবিকৃত অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ। এমন প্রেক্ষাপটে, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ দীর্ঘমেয়াদি বন্ডগুলোর তারল্য সংকট কাটানোর জন্য ১৯ আগস্ট একটি পদক্ষেপ নেয়। তারা বন্ড বায়ব্যাক (পুনঃক্রয়) কর্মসূচির আকার দ্বিগুণ করার ঘোষণা দেয়, যার ফলে প্রতি কার্যক্রমে এই আকার ২ বিলিয়ন থেকে অন্তত ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়। এই উদ্যোগের ফলে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ নতুন বন্ড কেনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বন্ডের পাশাপাশি মুদ্রাবাজারেও প্রভাব দেখা গেছে; নীতি সুদহার বৃদ্ধির কারণে মার্কিন ডলারের মান জুলাই মাস পর্যন্ত অনেক শক্তিশালী ছিল। অন্যদিকে জাপানি ইয়েনের মান কমে যাওয়ায় জুলাই মাসের শেষে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ করে। ইক্যুইটি মার্কেট এবং প্রযুক্তি খাতের অস্থিরতা প্রযুক্তি খাতে সম্প্রতি এক অভূতপূর্ব রদবদল দেখা গেছে। বছরের প্রথমার্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে রাজত্ব করলেও, জুন মাসের শেষ দিক থেকে এই গতি কিছুটা কমতে শুরু করে। হাইপারস্কেলার কোম্পানিগুলোর প্রচুর ঋণগ্রহণ এবং এআই খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের কারণে তাদের ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। ফলশ্রুতিতে, এসব প্রতিষ্ঠানের মূল্য-আয় অনুপাত প্রায় ১৫ শতাংশ কমে যায় এবং সেমিকন্ডাক্টর প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এই অনুপাত প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। এই বড় ধরনের সংশোধনের ফলে বিনিয়োগকারীরা তাদের মূলধন অন্যান্য খাত এবং দেশের দিকে সরিয়ে নিতে শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ছোট মূলধনের কোম্পানিগুলো প্রযুক্তি খাতের চেয়ে তুলনামূলক ভালো পারফর্ম করে। • ইউরোপীয় অঞ্চলের শেয়ারবাজার ব্যাংকগুলোর শক্তিশালী পারফরম্যান্সের কারণে বেশ চাঙা থাকে। • দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজার মূলত স্যামসাং এবং এসকে হাইনিক্স-এর মতো সেমিকন্ডাক্টর ও এআই কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় লিভারেজড ইটিএফ-এর কারণে চরম অস্থিরতার সম্মুখীন হয়। প্রাইভেট ক্রেডিট খাতের অভাবনীয় বিস্তার ২০২০ সালের পর থেকে প্রাইভেট ক্রেডিট খাতের বিশাল প্রবৃদ্ধির পেছনে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান ঋণের চাহিদাই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। প্রাইভেট ক্রেডিট মূলত সরাসরি ঋণ প্রদানের একটি মাধ্যম, যা প্রথাগত ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে কাজ করে। ২০২৫ সাল নাগাদ এই খাতে বকেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রযুক্তি খাতের সফটওয়্যার-অ্যাজ-এ-সার্ভিস এবং এআই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথাগত সম্পদের বদলে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ ও নিয়মিত আয়ের ওপর ভিত্তি করে এই ঋণ নিচ্ছে। • ২০১০ সালে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য প্রাইভেট ক্রেডিটের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ বিলিয়ন ডলার (মোট ঋণের ২২ শতাংশ), যা ২০২৫ সালে এসে ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলার (মোট ঋণের ৪৪ শতাংশ) ছাড়িয়ে গেছে। • বর্তমানে প্রায় ৫৫ শতাংশ প্রাইভেট ক্রেডিট ফান্ড প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে ঋণ দিচ্ছে। • যুক্তরাষ্ট্রের যে শহরগুলোতে প্রযুক্তি খাতের কর্মসংস্থান বেশি, সেখানে মহামারির পর প্রাইভেট ক্রেডিটের বৃদ্ধি প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি দেখা গেছে, যা ওই এলাকাগুলোতে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়তা করেছে। আফ্রিকা ও উদীয়মান বাজারের ঋণ পরিস্থিতি আফ্রিকার কর্মক্ষম জনসংখ্যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাড়ছে, যা অচিরেই উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং চীনকে ছাড়িয়ে যাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে, ২০০৯ সালের বিশ্বমন্দার পর থেকে আফ্রিকায় আন্তর্জাতিক ঋণের প্রবাহ অভাবনীয় হারে বেড়েছে। ২০০৯ সালের শেষে আফ্রিকার দেশগুলোতে আন্তঃসীমান্ত ব্যাংক ঋণের স্থিতি ছিল ১০০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২৬৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য সময়ে আন্তর্জাতিক বন্ডের আকার ২৭ বিলিয়ন ডলার থেকে সাত গুণ বেড়ে ১৯২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০১৩ সালে এই বন্ডের আকার ছিল মহাদেশটির মোট জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আফ্রিকার এই ঋণ প্রবাহে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পের মাধ্যমে। ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত চীনা ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদান উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে এবং তারা আফ্রিকার সবচেয়ে বড় ঋণদাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে চীনা ব্যাংকগুলো আফ্রিকার ৪০টিরও বেশি দেশে ঋণ দিচ্ছে এবং অন্তত ২৪টি দেশে তারা এককভাবে প্রধান ঋণদাতা। বিআরআই-এর আওতাভুক্ত ঋণের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশই মার্কিন ডলারে গৃহীত, ফলে চীনা মুদ্রার ব্যবহার সেখানে বেশ সীমিত। তবে ২০২০ সালের পর থেকে চীনা ঋণের গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে এলে ফরাসি, দক্ষিণ আফ্রিকান এবং মার্কিন ব্যাংকগুলো পুনরায় তাদের ঋণ প্রদান বাড়াতে শুরু করে। মজার ব্যাপার হলো, আফ্রিকার এই ব্যাংক ঋণের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয় লন্ডনের মাধ্যমে। নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা এবং ঘানার মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক বন্ড মার্কেট থেকে বিপুল ঋণ নিচ্ছে, আর দক্ষিণ আফ্রিকা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজ দেশের মুদ্রায় (র্যান্ড) বন্ড বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে। ব্যাংক নির্বাহীদের বেতন-ভাতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর ব্যাংক নির্বাহীদের বেতন-ভাতা নির্ধারণে বড় ধরনের সংস্কার আনা হয়, যাতে নির্বাহীরা অতিরিক্ত ঝুঁকি না নেন। নীতিমালায় বলা হয়েছিল যে, পরিবর্তনশীল ভাতার একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদে স্থগিত বা ডেফারাল হিসেবে প্রদান করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যাংকগুলো তাদের প্রধান নির্বাহীদের ভাতার একটি অংশ গড়ে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ মাস পর্যন্ত স্থগিত রাখে এবং ভাতার ওপর একটি নির্দিষ্ট সীমা আরোপ করে। অন্যদিকে মার্কিন ব্যাংকগুলোতে এই সময়কাল গড়ে ২৫ থেকে ৩০ মাস। দীর্ঘমেয়াদি এই স্থগিতকরণের ফলে ব্যাংকগুলোতে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমেছে। তবে, ব্যাংকগুলো এখনও তাদের নির্বাহীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে ‘রিটার্ন অন ইক্যুইটি’ সূচকটির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই লিভারেজ ঝুঁকিকে প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হয়। ২০২৩ সালে সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক এবং ক্রেডিট সুইস-এর পতনের সময় দেখা গেছে যে, ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ঝুঁকি ও আর্থিক পারফরম্যান্সের অবনতি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। মূল্যস্ফীতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর যোগাযোগ কৌশল মূল্যস্ফীতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর প্রকাশনায় ‘কোর ইনফ্লেশন’ বা মূল মূল্যস্ফীতির উল্লেখ লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোর ইনফ্লেশন হিসাব করার সময় খাদ্য ও জ্বালানির মতো পরিবর্তনশীল খাতগুলোকে বাদ দেওয়া হয় অথবা ‘ট্রিমড মিন’ পদ্ধতি ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তিত হওয়া পণ্যের দামগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। মহামারি-পূর্ববর্তী সময়ে যখন মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে কম ও স্থিতিশীল ছিল, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি মূল্যের চাপ বোঝার জন্য কোর ইনফ্লেশনের ওপর বেশি জোর দিত। কিন্তু মহামারির পর বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং যুদ্ধের কারণে যখন জ্বালানি ও খাদ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে, তখন সাধারণ মানুষ ও বাজারের সংশয় দূর করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট খাতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও তাদের প্রতিবেদনে বিস্তারিত আলোচনা করতে হয়। বিশ্ব অর্থনীতি এখন একটি অত্যন্ত জটিল ও পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বন্ড ও শেয়ারবাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, প্রাইভেট ক্রেডিটের বিস্তার ঘটছে এবং আফ্রিকার মতো উদীয়মান বাজারগুলোতে নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। News PhotoCard SHARES অর্থনীতি বিষয়: