সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নেয়া বাড়তি বোনাস ১১৬ কোটি টাকা ফেরতের নির্দেশ প্রকাশিত: ৩:২৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬ ফারজানা ফারাবী : নীতিমালা লঙ্ঘন করে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেয়া পাঁচটি উৎসাহ বোনাসের প্রায় ১১৬ কোটি টাকা ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ২০২৩ সালের কর্মদক্ষতার জন্য নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিনটি বোনাস দেওয়ার সুযোগ থাকলেও ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া হয় পাঁচটি। বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ দেড় বছর আগে ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও এখনো আদায় হয়নি। সোনালী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২১ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী পাঁচটি উৎসাহ বোনাস পেয়েছেন। প্রতিটি বোনাসের পরিমাণ মূলত এক মাসের মূল বেতনের সমান। ব্যাংকের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, একটি বোনাসের পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টাকা। সে হিসাবে বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ দাঁড়ায় প্রায় ১১৬ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৭ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আফজাল করিমকে অবরুদ্ধ করে রেখে তাঁদের অন্যতম দাবি বছরে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস আদায় করে নেন। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা এবং ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী তিনটির বেশি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার সুযোগ ছিল না। আন্দোলন চলার মধ্যেই তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ চাপের মুখে পাঁচটি বোনাস অনুমোদন করে। পরে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিরীক্ষা আপত্তি ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এতে সম্মতি দেয়নি। বোনাসের দাবিকে কেন্দ্র করে চাপের মুখে ২০ আগস্ট পদত্যাগ করেন ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী। এরপর ২৮ আগস্ট চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগের আগ পর্যন্ত তিনিও বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত বাড়তি বোনাসের অর্থ ফেরত নেওয়া বা বিষয়টি নিয়মিত করার কোনো সমাধান হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে চিঠি দিয়ে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দেয়। ওই অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা বলা হয়। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে আবারও চিঠি দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। গত ১১ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকের এমডিকে পাঠানো চিঠিতে ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়ে অসম্মতি জানানো হয়। একই সঙ্গে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সালের নীতিমালা কিংবা ২০২৫ সালের নতুন নীতিমালা—কোনোটিতেই সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি উৎসাহ বোনাস নেওয়ার সুযোগ ছিল না। বোনাস দেওয়ার পর সোনালী ব্যাংক তা অনুমোদনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আবেদনও করেছিল। নীতিমালা লঙ্ঘনের জন্য ক্ষমা চেয়ে পাঁচটি বোনাস অনুমোদনের অনুরোধ জানানো হয়। তবে নিজেদের করা নীতিমালা লঙ্ঘন করে সেই অনুমোদন দেয়নি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সোনালী ব্যাংকের এমডি ও সিইও শওকত আলী খান বলেন, পাঁচ বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি ব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগেই নেওয়া হয়েছিল। টাকা পরিশোধ হয়ে যাওয়ায় সরকারকে বিষয়টি অনুমোদন করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। নতুন করেও একই অনুরোধ জানানো হবে বলে তিনি জানান। সোনালী ব্যাংকের বোনাস নিয়ে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর ২০২৫ সালের ১১ মার্চ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে দেওয়া চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ২০২৩ সালের জন্য পাঁচটি উৎসাহ বোনাস বাবদ ব্যাংকটি ২৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। একইভাবে ২০২৪ সালের জন্য ৪০০ কোটি টাকা সংস্থান রাখা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানায়, সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব বোনাস নীতিমালাতেও তিনটির বেশি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার সুযোগ নেই। এরপরও ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ব্যাংকের ৮৭০তম পর্ষদ সভায় পাঁচটি বোনাস দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। পর্ষদের ওই অনুমোদনে শর্ত দেওয়া হয়েছিল, ভবিষ্যতে নিরীক্ষা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে কোনো আপত্তি উঠলে বাড়তি অর্থ ফেরত দিতে হবে। এ জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত অঙ্গীকারনামাও নেওয়ার কথা বলা হয়। শুধু সোনালী ব্যাংক নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ও সরকারি অন্যান্য ব্যাংকেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর উৎসাহ বোনাস দেওয়ার জন্য নতুন নির্দেশিকা জারি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বোনাস দেওয়ার আগে নির্দিষ্ট সূচকে মূল্যায়ন করতে হবে। সোনালী, অগ্রণীসহ ছয় রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে পাঁচটি সূচক বিবেচনায় নেওয়া হবে। এগুলো হলো—চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হার, আমানত বৃদ্ধির হার, ঋণ ও অগ্রিম বৃদ্ধির হার, শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে নগদ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আদায়ের হার এবং অবলোপনকৃত ঋণ থেকে নগদ আদায়ের হার। এর মধ্যে চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মোট নম্বরের ভিত্তিতে বোনাসের সংখ্যা নির্ধারিত হবে। সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সর্বোচ্চ তিনটি উৎসাহ বোনাস পাবেন। নম্বর কম হলে বোনাসের সংখ্যাও কমবে। আর নির্ধারিত মাত্রার নিচে নম্বর হলে কোনো উৎসাহ বোনাসও দেওয়া হবে না। ফলে নতুন ব্যবস্থায় বোনাসের সংখ্যা নির্ধারণ শুধু কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে না; ব্যাংকের আর্থিক ফলাফল, আমানত ও ঋণ প্রবৃদ্ধি এবং খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের সক্ষমতার সঙ্গেও তা সরাসরি যুক্ত থাকবে। News PhotoCard SHARES অর্থনীতি বিষয়: