ব্যাংক লুটপাটের সংস্কৃতি ঋণখেলাপির চেয়েও মারাত্মক: ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

প্রকাশিত: ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিনিধি :

দেশের ব্যাংক খাত একসময় ঋণখেলাপির সংস্কৃতিতে আক্রান্ত ছিল। পরে নানা সংস্কার ও বিধিবিধানের মাধ্যমে সেখান থেকে বেরিয়ে এলেও ২০১০ সালের পর নতুন করে ‘ব্যাংক লুটপাটের সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

তিনি বলেন, ঋণখেলাপির সংস্কৃতির চেয়ে ব্যাংক লুটপাটের সংস্কৃতি আরও মারাত্মক। কোনো নিয়মকানুন ছাড়াই ব্যাংক থেকে টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের আর্থিক খাত আজকের খারাপ অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) মিলনায়তনে প্রতিষ্ঠানটির আয়োজিত দুই দিনব্যাপী বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে এসব কথা বলেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

ব্যাংক খাত সংস্কারে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ঋণখেলাপির সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার জন্য অনেক কষ্টে নানা নিয়মকানুন তৈরি করা হয়, সংস্কার করা হয়। পাশাপাশি বিধিবিধান বানিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলাম। কিছু বেসরকারি ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। কিন্তু এরপর শুরু হয় ব্যাংক লুটপাটের সংস্কৃতি। এটা আরও মারাত্মক। কোনো নিয়মকানুন ছাড়া ব্যাংক থেকে টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এমনকি শিক্ষকদের যে বেতন-ভাতা, কল্যাণ তহবিল ও পেনশনের তহবিল নিয়ে তারা ব্যাংক খুলেছে। পরবর্তী সময়ে সেই ব্যাংকগুলো সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে যায়। আর দরিদ্র শিক্ষক, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কোটি কোটি টাকার পেনশন ও কল্যাণ তহবিল আটকে পড়ে। সেই তহবিলের টাকা এখনো আটকে আছে।

ব্যাংক খাতের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এত বছরের ব্যাংকিং খাতের যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। আমরা নতুন করে আবার শিখতে যাব কেন? অনেক বিতর্ক আমরা বহু আগেই করেছি। অতীতে আমরা উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো না বানিয়েই বেসরকারি খাতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়েছিলাম। এর পরিণতি কী হয়েছিল? সেই সময় আমরা দেখেছি যে উদ্যোক্তা পরিচালকেরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে মোট আমানতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩৫ শতাংশের সমান) ঋণ হিসেবে তুলে নিয়েছিলেন।

একটি গোষ্ঠী বা পরিবারের একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ থাকা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, একটি গোষ্ঠী বা পরিবার একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে কি না, এ নিয়ে নিয়ম থাকা দরকার ছিল, যা ‘অ্যান্টি-ট্রাস্ট’ (একাধিপত্য-বিরোধী) আইনের আওতায় আসা উচিত। আমাদের এখনো কোনো অ্যান্টিট্রাস্ট বা অ্যান্টিমনোপলি আইন নেই।

রাজনৈতিক সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় ব্যাংককে সুযোগ-সুবিধা বিতরণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক কারণে সরকার যদি সুযোগ-সুবিধা দিতেই চায়, তাহলে এমন খাত বেছে নেওয়া উচিত, যাতে দেশের অর্থনীতির বড় কোনো ক্ষতি না হয়। ব্যাংকিং বা আর্থিক খাতের মাধ্যমে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা করা অনুচিত।

২০১০ সালের পর কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া ‘দলে দলে’ নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়ার কারণেই কিছু ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। এসব ব্যাংকের কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আমানতও গ্রহণ করেছিল বলে জানান তিনি।

গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাতের বিধিবিধান অতিরিক্ত শিথিল করার কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এখন দুর্বল ব্যাংককে উদ্ধার করতে হলে নিয়মকানুন আবার কিছুটা শিথিল করতেই হবে। কিন্তু অতীতে যেভাবে নিয়মকানুন শিথিল করেও আমরা আজকের এই খারাপ অবস্থায় এসে পৌঁছালাম, আবার সেটার পুনরাবৃত্তি হবে না, সেই গ্যারান্টি কোথায়?

ব্যাংক খাতকে বর্তমান সংকট থেকে বের করে আনতে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে আমাদের পর্যাপ্ত সেফগার্ড (সুরক্ষা কবচ) রাখতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্র আলাদাভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে যেন সৎ, প্রকৃত উদ্যোক্তা ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের হাতে টাকা পৌঁছায়। এই ব্যবস্থা যদি আমরা সুনিশ্চিত করতে না পারি, তবে আমরা আবার আগের পুরোনো গর্তেই পতিত হব।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহম্মদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার।