স্বদেশ লাইফে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ

প্রকাশিত: ৭:৩৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৮, ২০২৫

নিজস্ব প্রতিনিধি :

অভ্যন্তরীণ সংকটে বিপর্যস্ত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম

ইনস্যুরেন্স খাতের প্রতিষ্ঠান স্বদেশ লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড আবারও গুরুতর অভিযোগের মুখে। দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে থাকা অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট এবং আর্থিক স্বচ্ছতার সংকট এবার প্রকাশ্যে এসেছে কোম্পানিরই একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসভিপি) মো. আলমগীর শেখের মাধ্যমে। তিনি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারি, আইন লঙ্ঘন, ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা এবং পরিকল্পিত সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ তুলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

৮ ডিসেম্বর জমাকৃত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন—স্বদেশ লাইফের অভ্যন্তরে বহু বছর ধরে একটি প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। তারা বিনিয়োগ খাত, কমিশন বণ্টন, শাখার হিসাব, দাবি নিষ্পত্তির নথি এবং ব্যয়ের খাত—সব জায়গাতেই জালিয়াতি ও অনিয়ম করে আসছে। তার অভিযোগ, গ্রাহকদের জমা দেওয়া কোটি কোটি টাকার প্রিমিয়াম নিয়ম অনুসারে বিনিয়োগ না করে ব্যক্তিগত স্বার্থে বা অস্বচ্ছ খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি—মিথ্যা আয়-ব্যয়ের হিসাব তৈরি করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার ইচ্ছেমতো আর্থিক রিপোর্ট সাজানো হয়। অডিটরদের দেওয়া তথ্য গোপন রাখা, বার্ষিক আর্থিক বিবরণী ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘসূত্রতায় ফেলা এবং শাখা পর্যায়ে অনিয়ম ঢাকতে প্রভাব খাটানো ছিল নিয়মিত বিষয়।

আগের তদন্ত ও নিয়ন্ত্রকের ব্যবস্থা

এটি প্রথম নয়—এর আগে স্বদেশ লাইফ নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতির কথা উঠে আসার পর আইডিআরএ কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত সিইও-এর নবায়ন বাতিল করেছিল। তার বিরুদ্ধে ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ–বাণিজ্য, কমিশন বণ্টনে অনিয়ম, নির্দেশ অমান্য এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তিকে ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগ।

বেশ কয়েক বছর ধরেই প্রতিষ্ঠানটির বিপর্যস্ত আর্থিক কাঠামো ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। গ্রাহকদের দাবি ছিল—স্বদেশ লাইফ বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও দাবি নিষ্পত্তি, হিসাব স্বচ্ছতা এবং তদারকির উন্নতিতে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

তদন্ত দাবি ও প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

এসভিপি আলমগীর শেখ তার অভিযোগে লিখেছেন—“কোম্পানির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিয়মে জড়িত একটি সংগঠিত গোষ্ঠী সক্রিয়। তারা চাইলে কোনো ফাইল ছাড়ে না, আর প্রয়োজনে নথি গায়েব করে। প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে হলে দ্রুত তদন্ত প্রয়োজন।”

অভিযোগের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অন্যান্য নজরদারি সংস্থায়। আইডিআরএ সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে বিশেষ অডিট বা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করা হবে।

গ্রাহক আস্থা হ্রাস ও বাজারে নেতিবাচক প্রভাব

স্বদেশ লাইফের ধারাবাহিক অনিয়ম পুরো বিমা খাতে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। দাবি নিষ্পত্তির গতি ধীর হওয়া, সেবা–মানের অবনতি, গ্রাহককে হয়রানি—এসব অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে শোনা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ম চলতে থাকলে তা দেশের বিমা খাতের সামগ্রিক স্থিতি ও বাজারে আস্থা ক্ষুন্ন করবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথাসময়ে ব্যবস্থা না নিলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং গ্রাহকের টাকায় গড়ে ওঠা বিমা তহবিল ঝুঁকির মুখে পড়বে।