জীবন বীমায় অনিষ্পন্ন দাবি ৪,৪১০ কোটি টাকা, ৭৫ শতাংশই ফারইস্টের

প্রকাশিত: ৪:২২ অপরাহ্ণ, জুন ১৬, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিনিধি :

দেশের জীবন বীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ বেড়ে ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে এককভাবে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কাছেই আটকে আছে ৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকার বেশি দাবি, যা পুরো খাতের অনিষ্পন্ন দাবির প্রায় ৭৫ শতাংশ।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) প্রকাশিত ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) অনিরীক্ষিত দাবি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ শেষে দেশের ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানির মোট দাবির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮১২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৪০২ কোটি ৫৫ লাখ টাকার দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে। ফলে অনিষ্পন্ন থেকে গেছে ৪ হাজার ৪১০ কোটি ১২ লাখ টাকা।

কোম্পানিভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের মোট দাবি ছিল ৩ হাজার ৩৩৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে মাত্র ২৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার দাবি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির অনিষ্পন্ন দাবি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩১০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

এক বছর আগের তুলনায়ও ফারইস্টের অনিষ্পন্ন দাবি বেড়েছে। আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির অনিষ্পন্ন দাবি ছিল ২ হাজার ৯১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ৩ হাজার ৩১০ কোটি ৪৩ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।

একই সময়ে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অনিষ্পন্ন দাবি ২৪০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২৬০ কোটি ৯০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অনিষ্পন্ন দাবি ১৭৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২০৮ কোটি ৯ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অনিষ্পন্ন দাবি ১৬০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা থেকে সামান্য কমে ১৫৯ কোটি ২৩ লাখ টাকায় নেমেছে।

বীমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, বীমা দাবির আবেদন পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক গ্রাহককে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছরও দাবি পরিশোধের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের গ্রাহক নুর হোসেন বাণিজ্য বার্তাকে বলেন, ‘আমি ১২ বছর মেয়াদি একটি বীমা পলিসি নিয়েছিলাম। ২০২২ সালে পলিসিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু চার বছর পার হয়ে গেলেও এখনো আমার পাওনা অর্থ ফেরত পাইনি।’

তিনি বলেন, ‘টাকা পাওয়ার আশায় বহুবার কোম্পানির কার্যালয়ে যোগাযোগ করেছি। প্রতিবারই আজ হবে, কাল হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও কোনো সমাধান পাইনি। নিজের প্রয়োজনের সময় এই টাকা কাজে লাগাতে পারছি না। এতে আর্থিক ও মানসিকভাবে ভোগান্তির মধ্যে আছি।’

ফারইস্টে অনিষ্পন্ন দাবির বিপুল পরিমাণের পেছনে দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়মকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। ২০২১ সালে সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানিকে দিয়ে পরিচালিত আইডিআরএর এক নিরীক্ষায় কোম্পানিটিতে ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য উঠে আসে। এছাড়া আরও ৪৩২ কোটি টাকার হিসাবে অনিয়ম পাওয়া যায়।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজারদরের তুলনায় বেশি দামে জমি কেনা এবং কোম্পানির মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্ট (এমটিডিআর) বন্ধক রেখে ব্যাংকঋণ নেওয়ার মাধ্যমে এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইডিআরএর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের কারণে কোম্পানিটির পক্ষে নিয়মিত বীমা দাবি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে জীবন বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

অনিষ্পন্ন দাবির বিষয়ে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম এমপি বাণিজ্য বার্তাকে বলেন, ‘কোম্পানির মালিকানাধীন জমি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব সম্পদ বিক্রি করতে পারলে বকেয়া দায় পরিশোধ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে ব্যবসা থেকে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে এত বড় অঙ্কের দায় পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তাই সম্পদ বিক্রিই এখন সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। আমরা আশা করছি, শিগগিরই দায় পরিশোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে।’

অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির বকেয়া দাবি ২৬০ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

দাবি নিষ্পত্তি প্রসঙ্গে কোম্পানিটির ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মোস্তাফিদুজ্জামান বাণিজ্য বার্তাকে বলেন, ‘লাইফ ফান্ডে ঘাটতি থাকায় বর্তমানে বড় অঙ্কের দাবি পরিশোধে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে দাবি পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘তড়িঘড়ি নয়, পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হবে। আশা করছি, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে কোম্পানিটি আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।’

অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণে এরপর রয়েছে সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যার অনিষ্পন্ন দাবি ২০৮ কোটি ৯ লাখ টাকা। প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অনিষ্পন্ন দাবি ১৫৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা। জীবন বীমা করপোরেশনের অনিষ্পন্ন দাবি ৬৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

এ ছাড়া মেটলাইফ বাংলাদেশের ৬০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৩৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৩৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে।

অন্যদিকে, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অনিষ্পন্ন দাবি তুলনামূলকভাবে কম। এর মধ্যে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১২ কোটি ৬১ লাখ টাকা, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা, মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, আকিজ তাকাফুল লাইফ ইন্স্যুরেন্স, আলফা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, লাইফ ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন অব বাংলাদেশ, মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অনিষ্পন্ন দাবি নেই বা তা খুবই সামান্য।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ দাবি দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা জীবন বীমা খাতের আর্থিক সক্ষমতা ও গ্রাহক আস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ঝুলে থাকা দাবিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে জীবন বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে।

প্রায় শতভাগ দাবি পরিশোধকারী প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জালালুল আজিম বাণিজ্য বার্তাকে বলেন, ‘হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি এখনো ক্লেইম পরিশোধ করছে না। এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে কার্যকর ও জোরালো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, ফলে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে অ্যাসোসিয়েশনও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে না। পাশাপাশি আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান না থাকায় সামগ্রিক তদারকির কার্যক্রমে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।’

জালালুল আজিম বলেন, ‘কোম্পানিগুলোর উচিত দ্রুত ক্লেইম সেটেলমেন্ট নিশ্চিত করে খাতের ভাবমূর্তি উন্নত করা। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছি।’

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) পরামর্শক (মিডিয়া ও যোগাযোগ) ও মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বাণিজ্য বার্তাকে বলেন, ‘নিয়মিত গভর্ন্যান্স রিভিউ মিটিংয়ে বীমা কোম্পানিগুলোকে বিদ্যমান আইন, বিধিমালা ও নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা যথাযথভাবে প্রতিপালনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বীমা দাবি পরিশোধসংক্রান্ত যেসব আবেদন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা হয়, সেগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও তাগিদ দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘চলমান সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বীমা আইন, ২০১০-এর সংশোধিত খসড়া ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুমোদন ও কার্যকর হলে আইডিআরএর নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সক্ষমতা আরও জোরদার হবে। এর ফলে বীমা দাবি নিষ্পত্তি ও পরিশোধ প্রক্রিয়ায় কর্তৃপক্ষ আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে বলে কর্তৃপক্ষ মনে করে।’