ফারইস্ট ইসলামী লাইফের নতুন পলিসি বিক্রিতে আইডিআরএর নিষেধাজ্ঞা প্রকাশিত: ১:৩৮ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৪, ২০২৬ বিশেষ প্রতিনিধি: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জীবন বীমা কোম্পানি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের নতুন বীমা পলিসি ইস্যু এবং প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম (ফার্স্ট ইয়ার প্রিমিয়াম) সংগ্রহের ওপর পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা গ্রাহকদের বকেয়া বীমা দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে কোম্পানিটিকে একাধিক বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ বীমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা, আর্থিক সংকটের ক্রমাবনতি এবং নতুন পলিসি বিক্রির মাধ্যমে ভবিষ্যতে দায় আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে আইডিআরএ এ কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি জারি করা নির্দেশনা ইতোমধ্যে কোম্পানির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠানো হয়েছে এবং তা কার্যকর হয়েছে। আইডিআরএর নির্দেশনা অনুযায়ী, কোম্পানিকে সিকিউরিটিজ বন্ডে বিনিয়োগ করা ৬ কোটি টাকা সাত কার্যদিবসের মধ্যে উত্তোলন করে তা বীমা দাবি পরিশোধে ব্যয় করতে হবে। পাশাপাশি ২০২৬ সালের মধ্যে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বকেয়া বীমা দাবি কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সে বিষয়ে চলতি মাসের মধ্যেই একটি বাস্তবভিত্তিক, সময়সীমা নির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা আইডিআরএর কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া কোম্পানিকে তাদের সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় সম্পদ নগদায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। বিধিবদ্ধভাবে সংরক্ষিত বিনিয়োগ অক্ষুণ্ণ রেখে অবশিষ্ট অর্থ গ্রাহকদের বীমা দাবি পরিশোধে ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জমাকৃত দাবিগুলো ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট (FIFO)’ পদ্ধতিতে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, যাতে পুরোনো দাবিদাররা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের ন্যায্য পাওনা পান। আইডিআরএর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) শেষে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের গ্রাহকদের বকেয়া বীমা দাবি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩১০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। একই সময়ে কোম্পানিটির জীবন বীমা তহবিল (লাইফ ফান্ড) ঋণাত্মক ৯৪৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যা একটি জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক আর্থিক চিত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও কোম্পানিটির মোট সম্পদের পরিমাণ ৩ হাজার ১৪৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, তবুও বিপুল পরিমাণ দাবি ও আর্থিক ঘাটতির কারণে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কোনো বীমা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়লে নতুন পলিসি বিক্রি অব্যাহত রাখার অর্থ ভবিষ্যতে আরও নতুন দায় সৃষ্টি করা। এতে বিদ্যমান গ্রাহকদের দাবি নিষ্পত্তি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সে কারণেই নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিবর্তে বিদ্যমান গ্রাহকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তকে বাস্তবসম্মত ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আব্দুর রহিম ভূঁইয়া বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে আইডিআরএর নির্দেশনা পেয়েছি। নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।” বীমা খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকদের বকেয়া দাবি, আর্থিক অনিয়ম এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে দেশের জীবন বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে গ্রাহকস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আইডিআরএর কঠোর নজরদারি ও প্রয়োজনে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি ছিল। তারা আরও বলেন, আইডিআরএর বর্তমান চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যেসব কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা বীমা খাতে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নতুন দায় সৃষ্টি বন্ধ রেখে বিদ্যমান গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তারা সময়োপযোগী, সাহসী ও জনবান্ধব উদ্যোগ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। শিল্পসংশ্লিষ্টদের অভিমত, শুধু ফারইস্ট ইসলামী লাইফ নয়, যেসব বীমা কোম্পানির বিপুল পরিমাণ দাবি বছরের পর বছর অনিষ্পন্ন রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কার্যকর তদারকি, নিয়মিত মনিটরিং এবং প্রয়োজনে কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এতে একদিকে গ্রাহকদের অধিকার সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে সুশাসন ও আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের বীমা শিল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আইডিআরএর এ ধরনের পদক্ষেপ ভবিষ্যতেও ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে দুর্বল বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক পুনর্গঠন, কার্যকর ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দেশের বীমা শিল্প আরও শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও গ্রাহকবান্ধব খাতে পরিণত হবে। News PhotoCard SHARES অর্থ নিউজ বিষয়: