সিইও পদ নিয়ে ধুম্রজাল প্রতারণা ও আইন লংঘন করছে গার্ডিয়ান লাইফ! প্রকাশিত: ৭:৫৯ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২০, ২০২৫ বিশেষ প্রতিনিধি : শেখ রাকিবুল করিম। গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সে আলোচিত এক নাম। ২০১৯ সালে প্রথমে ‘এসইভিপি ও সিএফও’ হিসেবে যোগদান করেন। এরপর ডিএমডি হিসেবে পদোন্নতি লাভ করে ২০২১ সালে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হন। আরব মধ্যপ্রাচ্যের লোককাহিনী আলাদিনের প্রদীপের রূপকথার গল্পের মতো গার্ডিয়ান লাইফে উত্থান। বিস্ময়কর ও সুপ্রসন্ন ভাগ্য তার। মাঝখানে আবারো ২০২৪ সালে পদন্নতির ছোঁয়ায় হয়ে যান এডিশনাল এমডি। শুধু তাই নয়, এখন তিনি ‘সিইও’ -এমনটাই জানান দিচ্ছে গার্ডিয়ান লাইফ! বীমা খাতে কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ২০১৯ সালে গার্ডিয়ান লাইফে যোগদান করেন রাকিবুল। অল্প ক’বছরেই একের পর এক ‘জ্যামিতিক হারে পদোন্নতি কিংবা সিইও’ হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্তি ‘মিরাকল’ বলছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে কোন নিয়মনীতি, বীমা আইন কিংবা প্রবিধানের তোয়াক্কা করেনি গার্ডিয়ান। দীর্ঘবছর আইন লংঘন করে এখনো স্বপদে বহাল তবিয়তে আছেন তিনি। এদিকে গার্ডিয়ান লাইফে শেখ রাকিবুলের ‘পদ’ নিয়ে চলছে ধ্রুমজাল। জন্ম দিচ্ছে প্রশ্নের- তিনি কি ‘সিইও, নাকি ভারপ্রাপ্ত সিইও’ হিসেবে কাজ করছেন? আর এ ক্ষেত্রে বীমা আইন কি বলছে? প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ওয়েব সাইটে https://www.guardianlife.com.bd/ বিভিন্ন কার্যক্রম ও যাবতীয় তথ্য দেয়া হয়েছে। সেখানে পরিচিতি পর্বে ব্যবস্থাপনা কমিটির তালিকায় শেখ রাকিবুল করিমের পরিচয় ও পদবি ‘এডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর এন্ড অ্যাক্টিং সিইও’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে, একই ওয়েব ওয়েবসাইটের মিডিয়া গ্যালারিতে রাকিবকে ‘সিইও’ হিসেবে দাবী করা হয়েছে। এমনকি ২০২৩ সাল থেকে বিভিন্ন কর্মকান্ড, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্পোরেট চুক্তির ক্ষেত্রে রাকিব প্রতিষ্ঠানের সিইও- এমন পরিচয় তুলে ধরা হয়। অথচ, রাকিবকে সিইও হিসেবে কোন অনুমতি দেয়নি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। তাই সিইও হিসেবে ভুয়া পদবী ব্যবহার নিয়ে তৈরী হয় বিপত্তি ও আইনগত জটিলতা। এখানেই শেষ নয়, ভয়াবহ জালিয়াতির আরো দিক হচ্ছে, গার্ডিয়ান লাইফের অফিশিয়াল কাগজপত্রে তিনি ‘সিইও’ হিসেবে স্বাক্ষর করছেন! সেই কপিও প্রতিষ্ঠানের ওয়েব সাইটেও দেয়া হয়েছে। বছরের পর বছর চলছে এমন অভিনব প্রতারণা ও মিথ্যাচার। তাদের এহেন অপ-কৌশল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, নানান অপরাধে যুক্ত হয়ে এমনিতেই প্রশ্নবিদ্ধ বীমা খাত। এরমধ্যে গার্ডিয়ানের মতো বড় একটি প্রতিষ্ঠানে এমন আইন লংঘন, প্রতারণা, জালিয়াতি আর মিথ্যাচার বীমা খাতের ইমেজ- আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্থ করে তুলবে। মূলত, আইডিআরএর দূর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগ নিয়ে আইন বিরোধী কর্মকান্ড করছেন অপরাধীরা- এমনটাই মনে করছেন সবাই। তারা বলছেন, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ দিন নিয়মিত সিইও নিয়োগ না করে- প্রকাশ্যে বিমা আইন ভঙ্গ করছে। আর বিষয়টি অবৈধ জেনেও অদৃশ্য কারণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হচ্ছে আইডিআরএ। বীমা কোম্পানি আইনের ৮০ ধারার ৪ উপধারায় বলা হয়েছে, বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদ একাধারে তিন মাসের অধিক সময়ের জন্য শূন্য রাখা যাবে না। তবে শর্ত থাকে যে কর্তৃপক্ষ অপরিহার্য পরিস্থিতি বিবেচনায় উক্ত সময়সীমা আরো তিন মাস বাড়াতে পারবে। ৫ উপধারায় বলা হয়েছে, উপধারা ৪ এর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো বীমা কোম্পানি মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদ পূরণ না করলে কর্তৃপক্ষ কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের জন্য প্রশাসক নিয়োগ করতে পারবে। আইডিআরএর নির্ধারণ করা প্রশাসকের বেতন ও অনান্য সুবিধাসহ যাবতীয় ব্যয় পরিশোধ করতে হবে কোম্পানীকে। একইসঙ্গে বীমা আইন ও প্রবিধানমালা প্রতিপালন করতে হবে। দেশের বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান গার্ডিয়ান লাইফে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর নেই সিইও। গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ এ পদটিতে বীমায় পূর্ব অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তিকে ‘ভারপ্রাপ্ত’ দিয়ে-ই পরিচালিত হচ্ছে। আর এ অবস্থা চলছে বছরের পর বছর ধরে। অথচ, তিন-থেকে ছয় মাসের বেশি সময় সিইও পদ শূন্য থাকতে পারবে না- বীমা আইনে এমন বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করছে গার্ডিয়ান লাইফ। অথচ মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদ সর্বোচ্চ ৬ মাস শূন্য থাকলে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে বীমা আইন ২০১০ এ। অর্থাৎ আইন অনুসারে ছয় মাসের বেশি কোনোভাবেই ভারপ্রাপ্ত সিইও দিয়ে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ নেই। এই সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ একজন যোগ্যতাসম্পন্ন সিইও নিয়োগ দিবেন। অদ্ভুত ও বিস্ময়কর হচ্ছে, সিইও পদ ৫ বছর শূন্য থাকার পরও একদিকে সিইও নিচ্ছে না পরিচালনা পর্ষদ। অন্যদিকে আইডিআরএ থেকেও প্রশাসক নিয়োগের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বীমা কোম্পোনির ‘সিইও পদ’ সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম নষ্টের পাশাপাশি ব্যবসায়িক অবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যার ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠার এতোগুলো বছরেও পুঁজিবাজারে আসতে ব্যর্থ গার্ডিয়ান। ফলে প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে জরিমানা। এভাবে বিপুল পরিমান অর্থ জরিমানা পরিশোধের কারণে গ্রাহকদের বীমা দাবী পরিশোধে ঝুঁকির সম্ভাবণা বাড়ছে। বিশেজ্ঞরা মনে করেন, বীমা কোম্পানির মূল চালিকাশক্তি হলেন সিইও। সর্বোচ্চ এ পদ শূন্য রাখা আইনের লঙ্ঘন। এক্ষেত্রে আইনের যে বিধান রয়েছে তা পরিপালন না করাও আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বীমাখাতের শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের স্বার্থে কোন কোম্পানি ৬ মাসের মধ্যে মূখ্য নির্বাহী নিয়োগ দিতে না পারলে বীমা আইন অনুসারে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে গার্ডিয়ান লাইফের সিইও পদ থেকে অব্যহতি নেন এম এম মনিরুল আলম তপন। পরবর্তীতে ২০২১ সালে শেখ রাকিবুল করিমকে ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। আর বছরের পর বছর ধরে সিইও’র শীর্ষপদটি শূন্য রাখা হয়। এভাবে দীর্ঘ সময় ‘ভারপ্রাপ্ত’ সিইওর দায়িত্ব পালন ২০১৫ সালে প্রণীত নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইডিআরএ’র নির্দেশনায়, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ‘ভারপ্রাপ্ত’ হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কোম্পানি থেকে বেতন-ভাতা নেয়া ২০১২ সালে মানি লন্ডারিং আইনের লঙ্ঘন। কারণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আইনগতভাবে পুনরায় চুক্তি না হওয়ার আগে ওই পদে দায়িত্ব পালনের কোনো সুযোগ নেই। অথচ, গার্ডিয়ান লাইফের আগে বীমা খাতে কাজ করার কোন অভিজ্ঞতা ছিল না শেখ রাকিবুলের। বর্তমানে তিনি কোম্পানিটির শীর্ষ এ পদে আছেন। আর সব জেনেও কেন গার্ডিয়ানের পরিচালনা পর্ষদ আইন ভঙ্গ করে এমন ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, কি তাদের ক্ষমতার উৎস- প্রশ্ন সবার। বীমা আইন লংঘনের বিষয়টি স্বীকার করে গার্ডিয়ান লাইফের ভারপ্রাপ্ত সিইও শেখ রাকিবুল করিম বলেন, এভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়ে আইনগত কিছু সমস্যা আছে। তবে প্রতিষ্ঠানে কোন যোগ্য সিইও না পাওয়ায়, তিনি কাজ করছেন। তবে কর্পোরেট সুশাসন নিশ্চিত করে সুন্দরভাবে গার্ডিয়ান লাইফকে এগিয়ে নিচ্ছেন বলেও দাবী করেন রাকিব। একইসঙ্গে তার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশের কিছু শীর্ষ গ্রুপ ও মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে আইডিআরএর এক পরিচালক বলেন, ‘আইন লংঘনের বিষয়গুলো আমরা অনুসন্ধান করে দেখবো। এভাবে সিইও পদ শুন্য রাখার সুযোগ নেই, সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে প্রশাসক নিয়োগ করা যেতে পারে। প্রতারণা, জালিয়াতি কিংবা মিথ্যাচারে অভিযোগ প্রমাণ হলে কোম্পানির বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ নিয়ন্ত্রক সংস্থার অপর এক সদস্য জানান, অনেক ক্ষেত্রে কিছু কোম্পানি তাদের কার্যক্রম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও অনৈতিক সুবিধা হাতিয়ে নিতে পছন্দের লোককেই সিইও নিয়োগ দিতে চায়। তাই তারা সিইও পদে যোগ্যতা সম্পন্ন লোক না পাওয়ায় কারণ দেখিয়ে অযোগ্য লোকদেরকে নানা কৌশলে ‘ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্ব’ দিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করতে চায়। আইডিআরএ’র অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যক্তির সিইও হিসেবে কাজ করা বা দাবী করা বীমা আইন ২০১০-এর ৮০ ধারা এবং বীমা কোম্পানির সিইও নিয়োগ ও অপসারণ প্রবিধানমালা ২০১২-এর পরিপন্থী। আইডিআরএ’র অনুমোদন ছাড়া কেউ সিইও হিসেবে কাজ করতে পারবেন না। এমনকি বেতন-ভাতাও নিতে পারবেন না। তবে কোনো কোম্পানিতে সিইও’র পদ শূন্য থাকলে ওই পদের অব্যবহিত নিম্ন পদের কোনো কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে কোম্পানিতে ৩ মাস দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর নিয়ম মেনে সকল কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এখানে কোনভাবেই সিইও পদ ব্যবহার বা স্বাক্ষর করার কোন সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে আইন ভঙ্গের অপরাধে পরিচালনা পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে যথাযথ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আইডিআরএ’র পরিচালক (উপসচিব) ও মুখপাত্র মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এভাবে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে বছরের পর বছর কার্যক্রম পরিচালনার কোন সুযোগ নেই। আইডিআরএ বিষয়গুলো দেখবে, আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করবো, এক সপ্তাহ অপেক্ষা করুন- সকল কিছু স্পষ্ট হবে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আইডিআরএর চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। – প্রিয় পাঠক, ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি বেসরকারী বীমা খাতে ব্যবসা শুরু করে গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স। ১১ বছর তাদের পথ চলা, নানান সংকট ও সম্ভাবনার দিকগুলো নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ করবে অর্থবাংলাডটকম, আজ প্রথম পর্ব। ধারাবাহিক সংবাদের দ্বিতীয় পর্বে থাকবে, পুঁজিবাজার নিয়ে কোন অবস্থানে গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স- জানতে থাকুন আমাদের সঙ্গে। SHARES অভিযোগ বিষয়: