ট্রাম্পের ঝড়েও থেমে নেই বাংলাদেশ: বিনিয়োগ সামিটে বিশ্বকে তাক লাগাতে প্রস্তুত বিডা! প্রকাশিত: ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৬, ২০২৫ অর্থ নিউজ : বিশ্বমঞ্চে যখন একের পর এক অনিশ্চয়তার ঢেউ আছড়ে পড়ছে, তখন বাংলাদেশ নিজের গতিতে এগিয়ে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ৩৭ শতাংশ নতুন শুল্ক নীতির পর অনেক দেশ যখন ধাক্কা খেয়ে থমকে গেছে, তখন বাংলাদেশ বরং আরও সংগঠিত, আরও আত্মবিশ্বাসী। আর তারই প্রমাণ—বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট ২০২৫, যা ৭ থেকে ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকায়। এই সম্মেলনের আয়োজক বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। তাঁদের লক্ষ্য একটাই—বিশ্বকে জানিয়ে দেওয়া, বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য এখনো এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার নাম। শুল্কের ধাক্কা, প্রস্তুতির পাল্টা ধাক্কা ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপের ঘোষণার পরেই বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের মধ্যে একটা উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসেছে আত্মবিশ্বাসী বার্তা। বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানিয়েছেন, ৯ এপ্রিলের মূল সম্মেলনের আগেই একটি শুল্ক-প্রতিকার নীতিমালার খসড়া তৈরি হচ্ছে। তাঁর কথায়, “যাঁরা এ সম্মেলনে আসছেন, তাঁরা আমাদের অবস্থান খুব মনোযোগ দিয়ে দেখবেন—তাই আমরা তাদের আস্থার প্রতিফলন নিশ্চিত করতে চাই।” ৫০টি দেশ, ২৩০০ জন অংশগ্রহণকারী, ৫৫০ জন বিদেশি বিনিয়োগকারী এটাই হয়তো বাংলাদেশকে আজকের দিনে আরও সাহসী করে তুলেছে। বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ থেকে ইতোমধ্যে ২৩০০ জনের বেশি প্রতিনিধি নিবন্ধন করেছেন, যাঁদের মধ্যে অন্তত ৫৫০ জন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগকারী। তাঁদের চোখ এখন বাংলাদেশের পাঁচটি খাতে—নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, পোশাক শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ শিল্প, এবং কৃষি প্রক্রিয়াকরণ। সম্মেলনের মধ্যে একটি চমকপ্রদ আয়োজন হচ্ছে, কিছু নির্বাচিত বিনিয়োগকারীকে সরেজমিনে ঘুরিয়ে দেখানো হবে চট্টগ্রামের কোরিয়ান ইপিজেড, মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরী ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল—যাতে তাঁরা নিজের চোখে দেখে নিতে পারেন বাংলাদেশের সম্ভাবনার বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার বার্তা সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ শুল্ক নীতির প্রতিক্রিয়ায় পর্যায়ক্রমে কূটনৈতিক আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মার্কিন দূতাবাস এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে চলছে ধারাবাহিক সংলাপ। সরকারের টার্গেট স্পষ্ট—একটি উইন-উইন পরিস্থিতি তৈরি করা। চৌধুরী আশিকের কণ্ঠে তা-ই ঝরে পড়ে, “আমরা চাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি পণ্য আমদানি হোক। এতে বাণিজ্য ভারসাম্য ফিরবে এবং পারস্পরিক শুল্ক হ্রাস নিয়ে আলোচনার মঞ্চ তৈরি হবে।” চ্যালেঞ্জ নয়, সুযোগ দেখছেন অর্থনীতিবিদরা এখানে অনেকেই একমত—শুল্কের এ ধাক্কা একসাথে যেমন ঝুঁকি, তেমনি সম্ভাবনাও। প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের এমডি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই নীতি-পরিবর্তনের সাহস আসে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘টিকফা’-জাতীয় কোনো চুক্তিতে তুলা আমদানির ক্ষেত্রে কম শুল্ক, কিংবা পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায় করা যায়—তবে এটাই হবে বাংলাদেশের জন্য গেম-চেঞ্জার।” তাঁর মতে, বিনিয়োগকারীরা সহজেই পছন্দ বদলান না। বাংলাদেশের শ্রম শক্তি ও উৎপাদন খরচ এখনো বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণে সম্ভাবনার সুবাস সম্মেলনের এক নতুন দিগন্ত হচ্ছে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ। কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আমরা এত বড় কৃষিপণ্য উৎপাদক দেশ—কিন্তু তার প্রক্রিয়াকরণ আজও সীমিত। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ যদি আসে, তবে এই খাত বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের বড় উৎস হতে পারে।” তাঁর ভাষায়, “বাংলাদেশের ফলমূল ও শাকসবজি ইতোমধ্যে বহু দেশে যাচ্ছে। প্রণোদনা ও স্থিতিশীল নীতিমালার মাধ্যমে এই সম্ভাবনা ছড়িয়ে পড়তে পারে আরও বহুদূর।” শুধু বিদেশ নয়, দেশীয় বাজারও বড় আকর্ষণ সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশের সভাপতি আসিফ খান মনে করেন, “দেশীয় বাজারের আকারও এখন অনেক বড়, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নজর কেড়েছে।” তবে তিনি একথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে, দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ যেমন—জটিল রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া, দুর্বল অবকাঠামো—এসব সমস্যার সমাধান করতেই হবে। হাইটেক পার্ক থেকে আইটি ক্লাউড, সহজতর হচ্ছে বিনিয়োগ পরিবেশ বিডা ইতিমধ্যে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে—বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক, ইপিজেডে বিনিয়োগকারীদের জন্য সরলীকৃত রেজিস্ট্রেশন, নিরাপদ জমি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে। চৌধুরী আশিক বলেন, “পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর রপ্তানিতে এগিয়ে যেতে চাই আমরা। আইটি ও আইসিটি খাতে আগ্রহ বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের।” ঝড়ের মধ্যেও লড়াইয়ের প্রস্তুতি বিশ্ববাণিজ্যের হালচাল প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে। এমন সময়ে ট্রাম্পের একতরফা শুল্ক নীতি বাংলাদেশকে যেমন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, তেমনি এক নতুন সুযোগের দুয়ারও খুলে দিয়েছে। প্রশ্ন একটাই—এই সুযোগ বাংলাদেশ কীভাবে কাজে লাগাবে? সম্মেলনের সফল আয়োজন, নীতিগত প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কূটনৈতিক সংলাপ—সব মিলে এক নতুন পথচলা শুরু হয়েছে। এই পদক্ষেপ কি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে? এখনই উত্তর দেওয়া না গেলেও, এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়—ট্রাম্পের ঝড়ও থামাতে পারেনি বাংলাদেশকে। বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়েই প্রস্তুত লাল-সবুজের এই দেশ। SHARES অর্থনীতি বিষয়: