৯.১০ টাকার শেয়ার ১০ টাকায় বিক্রির চ্যালেঞ্জে ইউসিবি প্রকাশিত: ৫:৩৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২৬ নিজস্ব প্রতিবেদক : এক সময়ের অন্যতম শক্তিশালী বেসরকারি ব্যাংক ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) এখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটে। খেলাপি ঋণ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এই ঘাটতি আংশিক পূরণে শেয়ারবাজার থেকে ৭৭৫ কোটি টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাংকটি। তবে সেই উদ্যোগের শুরুতেই দেখা দিয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। বাজারে যেখানে ইউসিবির প্রতিটি শেয়ারের দাম ৯ টাকা ১০ পয়সা, সেখানে বিদ্যমান শেয়ারধারীদের কাছে রাইট শেয়ার বিক্রি করা হবে ১০ টাকা দরে। ফলে এই শেয়ার ইস্যু কতটা সফল হবে, তা নিয়ে বাজারে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সম্প্রতি ইউসিবির রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন দিয়েছে। অনুমোদন অনুযায়ী, বিদ্যমান শেয়ারধারীরা প্রতি দুটি শেয়ারের বিপরীতে একটি রাইট শেয়ার কেনার সুযোগ পাবেন। এর মাধ্যমে ব্যাংকটি ৭৭৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়। কিন্তু ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ইউসিবির শেয়ারের সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ৯ টাকা ১০ পয়সা দরে। সাধারণত রাইট শেয়ারের মূল্য বাজারদরের চেয়ে কিছুটা কম নির্ধারণ করা হয়, যাতে বিদ্যমান শেয়ারধারীরা নতুন শেয়ার কিনতে উৎসাহিত হন। ইউসিবির ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে উল্টোভাবে। ফলে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে বিনিয়োগকারীরা রাইট শেয়ার কিনবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ মার্চ পর্যন্ত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ইউসিবির মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ৬৩ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ হাজার ৭৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ১৬ শতাংশ। খেলাপি ঋণের মধ্যে ৯ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকাই আদায় অযোগ্য বা মন্দ ঋণ। খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংকটি বড় ধরনের প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতিতেও পড়েছে। বর্তমানে এই ঘাটতির পরিমাণ ৫ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। এছাড়া মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮৭ কোটি টাকায়। রাইট শেয়ারের মাধ্যমে ৭৭৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করা গেলেও মূলধন ঘাটতি পুরোপুরি দূর হবে না। একই সঙ্গে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকটির আর্থিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থাকবে। ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রামের একদল উদ্যোক্তার হাত ধরে যাত্রা শুরু করা ইউসিবি দীর্ঘদিন দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, ২০১৮ সালের পর থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর প্রভাবের সময় ভুয়া ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল পরিমাণ ঋণ অনুমোদন করা হয়। পরবর্তী সময়ে এসব ঋণের বড় অংশ খেলাপিতে পরিণত হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ২৮ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন এবং বিভিন্ন তদন্তে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার অবনতি ও ঋণ অনিয়মের বিস্তৃত চিত্র সামনে আসে। ইউসিবি থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী এবং ব্যাংকের কয়েকজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও চার্জশিট দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত আগস্টে ‘ক্রিসেন্ট ট্রেডার্স’ নামে একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে প্রথম মামলা করা হয়। পরে ডিসেম্বর মাসে আটটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আরও আটটি মামলা করে দুদক। চলতি বছরের মার্চে ‘প্রোগ্রেসিভ ট্রেডিং’ ও ‘ইম্পেরিয়াল ট্রেডিং’-এর নামে ২৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন করা হয়। দুদকের তদন্তে বলা হয়েছে, আরামিট গ্রুপের পিয়ন, হিসাবরক্ষকসহ বিভিন্ন কর্মচারীকে কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মালিক দেখিয়ে ঋণ নেওয়া হয়। পরে সেই অর্থ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাইট শেয়ার ইস্যু প্রসঙ্গে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম গণমাধ্যমে বলেন, রাইট শেয়ার কেনা বা না কেনা সম্পূর্ণ বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত। তবে কোনো শেয়ার অবিক্রীত থাকলে আন্ডাররাইটাররা ১০ টাকা দরেই সেগুলো কিনে নেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে। ইউসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ রশিদ গণমাধ্যমে বলেন, ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং মূলধন ঘাটতি আংশিক পূরণ করতেই রাইট শেয়ার ইস্যুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। News PhotoCard SHARES অর্থনীতি বিষয়: