ন্যাশনাল লাইফের সিইও কাজিম উদ্দিন ভুয়া সনদে বহাল তবিয়তে কর্মরত

প্রকাশিত: ২:২৫ পূর্বাহ্ণ, মে ৩, ২০২৪

বিশেষ প্রতিনিধি: শুরুটা যখন জালিয়াতির হাত ধরে, ধারাবাহিকতাও একই পথে। ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নির্বিঘ্নে তিন বছর কাটিয়ে দিলেন ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মো. কাজিম উদ্দিন। শুধু তাই নয় এবার নিয়োগপত্র নবায়নও করেছেন একই পন্থায়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র হাত দিয়েই পাচ্ছে এসব অনুমোদন। তবুও যেন দেখার কেউ নেই। বিমা খাতে সংকটের শেষ নেই, তার উপর বড় পদ ধারীদের অনিয়মে আরও বিতর্কিত হচ্ছে এই খাত।

‘কোন কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা যদি জালিয়াতি করে পদে বসেন, সেখানে সাধারণ গ্রাহকদের অনেক শঙ্কা থেকেই যায়। তাছাড়া বিমা খাতে বড় সংকট এখন গ্রাহকের টাকা না পাওয়া।’

জানা যায়, কাজিম উদ্দিনের শিক্ষাসনদ নিয়ে জোড়ালো প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও তার এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনুমোদন দিয়েছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। আইডিআরএ’র নিয়োগ অনুমোদনপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে কাজিম উদ্দিনকে নিয়োগ প্রদানের জন্য প্রথমবার ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে আইডিআরএ আবেদন করে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষ। তাদের এ আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ১ নভেম্বর থেকে পরবর্তী তিন বছরের জন্য প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে তাকে নিয়োগ প্রদান করে আইডিআরএ।

আইডিআরএ’র দেওয়া নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর একই সার্টিফিকেট দিয়ে ফের নিয়োগ নবায়নের জন্য আবেদন করা হয়। তার বিতর্কিত ভুয়া সার্টিফিকেট যাছাই-বাছাই ছাড়াই এবারও তাকে অনুমোদন দিয়েছে আইডিআরএ। তড়িগড়ি করে এই অনুমোদন নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে বীমাখাত সংশ্লিষ্টদের। ছোট কোম্পানির সিইওদের অনুমোদন পেতে নাকানিচুবানি খেলেও বড় কোম্পানির ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র বলে মনে করছেন তারা।

বিমা খাতের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নিয়োগ অনুমোদনপত্র অনুযায়ী, কাজিম উদ্দিন নিয়োগ পরবর্তী প্রতিমাসে ছয় লাখ টাকা করে মাসিক সম্মানি নিচ্ছেন। চিকিৎসাভাতা, ব্যক্তিগত গাড়ি, ড্রাইভার এবং জ্বালানিসহ অন্যান্য সব সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করে আসছেন তিনি।

আইডিআরএর কাছে নিয়োগপত্রের অনুমোদনের জন্য দাখিল করা কাজিম উদ্দিনের জীবন বৃত্তান্তসহ সংশ্লিষ্ট সব কাগজপত্রাদি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৮৪ সালে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার কাকৈরতলা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি।

এরপর জেলা শহরের নবাব ফয়জুন্নেসা সরকারি মহাবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে ব্যবসায় শিক্ষা থেকে দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন। কাজিম উদ্দিন ১৯৮৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর দীর্ঘ ৩২ বছরের ব্যবধানে বন্ধ থাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদিনের চেরাগের মত ২০১৮ সালে বিবিএ এবং ২০১৯ সালে এমবিএ পাসের সার্টিফিকেট আবিষ্কার করেন!

কোম্পানির সিইও পদে নিয়োগ লাভের সময় আইডিআরএতে উচ্চশিক্ষার সনদপত্র হিসেবেও তিনি দাখিল করেছেন অনুমোদনহীন কথিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া এই বিবিএ ও এমবিএর সনদ।

ব্যাংক বীমা অর্থ নিউজ এর হাতে আসা কাজিম উদ্দিনের সনদ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা থেকে সিজিপিএ ৩.৩৫ পেয়ে চার বছর মেয়াদি বিবিএ সম্পন্ন করেন।

এছাড়া একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরের বছর ২০১৯ সালে সিজিপিএ ৩.৪৩ পেয়ে একবছর মেয়াদি এমবিএ সম্পন্ন করেন। তার সবকটি সনদ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর কথিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ সনদ প্রাপ্তির মধ্যে সময়ের ব্যবধান দীর্ঘ ৩২ বছর।

বিশ্ববিদ্যালয়টির অনুমোদন আছে কি না এমন তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অমান্য, প্রাশসনিক অব্যস্থাপনা, অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতা এবং মানহীন শিক্ষাব্যবস্থার কারণে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে ইউজিসি। পরবর্তীতে সরকার কর্তৃক বন্ধ আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যার রিট পিটিশন নং- ১৬৭১/২০১৪। এরও প্রায় একদশক পর আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পেলেও নানান জটিলতার কারণে এখনো অনুমতি মেলেনি ইউজিসির। যার দরুণ অদ্যাবধি স্থগিত রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ সূত্রে জানা যায়, দ্যা ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা (ইউএনআইসি) সরকারের অনুমোদন লাভ করে ১৯৯৫ সালে। তবে নানা অনিয়মের কারণে ২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে সরকার।

দ্যা ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা থেকে নেয়া কাজিম উদ্দিনের বিবিএ ও এমবিএ’র সনদটির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের উপ-পরিচালক ড. মো. মহিবুল আহসান বলেন, দ্যা ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। আর যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়নি তার সনদ কেমন হবে সেটাতো বোঝাই যাচ্ছে।

বিমা খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ন্যাশনাল লাইফ দেশের শীর্ষস্থানীয় লাইফ বীমা কোম্পানি। যেখানে দেশের লাখ লাখ মানুষের আমানত রক্ষিত। এ ধরণের একটি কোম্পানির মুখ্য নির্বাহীর পদে ভুয়া সনদ দিয়ে নিয়োগ কোনভাবেই কাম্য নয়। এ ধরণের কর্মকান্ডে সরকারের উচিত বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া। অন্যথায় তা হবে বীমাখাতে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের অন্তরায়।

ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার অনুমোদনই নেই। সুতরাং এখান থেকে যে সার্টিফিকেট প্রদান করা হবে সেটা ভুয়া। এই প্রতিষ্ঠানের সনদপত্র ব্যবহার করে চাকরি করার সুযোগ নেই।

বিমা বিশেষজ্ঞরা বলেন, আইডিআরএ’র দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং সঠিক তদারকির অভাবে এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে। আবার এসবের ব্যাপারে আইডিআরএ অভিযোগ করলেও কিংবা সবকিছু জানা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগের বিষয়ে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সিইও কাজিম উদ্দিনকে মুটোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। তাই তার বিরুদ্ধে ভুয়া সনদ দিয়ে সিইও পদে অনুমোদনের বিষয়ে কিছু জানা সম্ভব হয়নি।

জানতে চাইলে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী ব্যাংক বীমা অর্থ নিউজকে বলেন, এই বিষয়ে কথা বলতে আমাদের মুখপাত্র রয়েছেন। আপনি তার সাথে যোগাযোগ করলে সব তথ্য জানতে পারবেন।

আইডিআরএ’র মুখপাত্র জাহাঙ্গীর আলমের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ব্যাংক বীমা অর্থ নিউজকে বলেন, সাধারণত পূর্বে একবার অনুমোদন পেলে পরবর্তীতে নিয়োগ নবায়নের ক্ষেত্রে তা যাছাই-বাছাই করা হয় না। তবে কেউ যদি আইডিআরএ অভিযোগ করে অবশ্যই কাগজপত্র ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে। তখন কোনো ধরনের প্রশ্ন আসলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।