প্রগ্রেসিভ লাইফের উদাসীনতায় ভোগান্তের স্বীকার সাধারণ গ্রাহক

প্রকাশিত: ২:৫০ অপরাহ্ণ, জুন ৮, ২০২৪

বিশেষ প্রতিনিধিঃ সত্তরোর্ধ্ব সখিনা বেগম। ২০১১ সালে একমাত্র মেয়ের নামে মাসিক ২০০ টাকা করে একটি ডিপিএস করেন প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্সে। ২০২১ সালে সেই ডিপিএসের মেয়াদপূর্তির পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। এরপর পেরিয়ে গেছে আরো তিন বছর। কিন্তু এখনো সঞ্চিত টাকা ফেরত পাননি তিনি।

তবে শুধু সখিনা নন, একইভাবে ভুক্তভোগী ফিরোজা, নাসিমা, মনোয়ারা ও পারভীনসহ আরো হাজার হাজার বীমা গ্রাহক বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । সখিনাসহ তারা সবাই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের বাসিন্দা। শুধু সীতাকুণ্ড নয় সব জেলাতেই রয়েছে ভুক্তভোগী গাহকগণ। তাদের অভিযোগ, মেয়াদপূর্তির পর তাদের কাছ থেকে ডিপিএসের বইসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা নেন সংস্থাটির সহকারী ম্যানেজার খাদিজা বেগম। মাঠকর্মী নিরুয়া আক্তার ও বিএম মনোয়ারা বেগমের মাধ্যমে এসব জমা নেয়া হয়। মেয়াদ শেষে মাসখানেকের মধ্যে তাদের হাতে চেক তুলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এসব বিষয়ে কথা বলতে গেলে ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। পরে সীতাকুণ্ড পৌর সদরের অফিসে গেলে নানা ধরনের জটিলতার কথা বলে সেখান থেকেও তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী নাসিমা আক্তার জানান, খাদিজা বেগমের মাধ্যমে মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে ১২ বছরের জন্য ডিপিএস করেন তিনি। কিন্তু প্রতিমাসে তাকে দুই হাজার ৩০০ টাকা করে জমা করার রশিদ দেওয়া হয়। রশিদে না থাকা বাকি টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তা মেয়াদপূর্তি শেষে বুঝিয়ে দেওয়া হবে বলে জানান খাদিজা। ২০২১ সালে মেয়াদ শেষে অফিসে কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়। এরপর থেকে খাদিজার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের পাশাপাশি অফিসে শতাধিকবার ধরনা দিয়েও ঐ টাকা কিংবা চেক পাওয়া যায়নি। কবে নাগাদ দেওয়া হবে, তা-ও বলতে নারাজ দায়িত্বরত কর্মকর্তারা।

আরেক ভুক্তভোগী মনোয়ারা জানান, ১২ বছরের জন্য এককালীন ৫০ হাজার টাকা জমা রেখেছিলেন তিনি। পাশাপাশি করেছিলেন মাসে ৫০০ টাকার ডিপিএসও। দুটিরই মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে আরো তিন বছর আগে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলেও এখনো টাকা বুঝে পাননি তিনি।

যাদের মাধ্যমে ভর্তি এবং টাকা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ, সেই মাঠকর্মী নিরুয়া আক্তার ও বিএম মনোয়ারা বেগম জানান, ইনস্যুরেন্স সম্পর্কে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা নেই তাদের। গ্রাহক সংগ্রহ ও টাকা উত্তোলনের জন্য তাদের চাকরি দিয়েছিলেন খাদিজা। খাদিজার পরামর্শে নতুন গ্রাহককে বুঝিয়ে ইনস্যুরেন্স করানোর পাশাপাশি গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসিক টাকা তুলে খাদিজার কাছে জমা দিতেন তারা।

জানতে চাইলে শতাধিক গ্রাহকের টাকা না পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্সের সহকারী ম্যানেজার খাদিজা বেগম। তিনি বলেন, কর্মীদের গাফিলতির কারণে মেয়াদপূর্তির পরও সঠিক সময়ে কাগজপত্র জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সময়ক্ষেপণ করে জমা দিলেও প্রতিষ্ঠানের অর্থসংকটের কারণে গ্রাহকের সঞ্চিত টাকার চেক দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জুলাই মাসে এসব গ্রাহকের চেক দেওয়া হবে বলে হেড অফিস থেকে জানানো হয়েছে।

বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম জহির জানান, মেয়াদপূর্তির পর টাকা না পাওয়া শতাধিক বিক্ষুব্ধ গ্রাহক ইনস্যুরেন্স কর্মকর্তা খাদিজাকে অবরুদ্ধ করেন। তিনি বিক্ষুব্ধ গ্রাহকদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এরপর ভুক্তভোগী কিছু গ্রাহককে নিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে সংস্থাটির সীতাকুণ্ড শাখা অফিসে যোগাযোগ করেন তিনি। কিন্তু সেখানে দায়িত্বরত কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। শেষে অফিস ইনচার্জের সঙ্গে কথা বললে গ্রাহক কবে নাগাদ টাকা পাবেন, সে বিষয়ে অবগত নন বলেও জানান তিনি।

সীতাকুণ্ড শাখা অফিসের ইনচার্জ নুর উদ্দিন বলেন, ডিপিএস ও মেয়াদি বিমাসহ বিভিন্ন প্রকল্পে টাকা রাখা প্রায় এক হাজার গ্রাহকের মেয়াদ পূর্তি হয়েছে। এসব গ্রাহক এক কোটি টাকা পাবেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের অর্থসংকটের কারণে তারা এ মুহূর্তে টাকা ছাড় করতে পারছেন না। জুলাই মাসে সারাদেশে সংস্থাটির যত অফিস রয়েছে, সেসব অফিসের জন্য দুই কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হবে। সেই হিসাবে তারা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পাবেন। সেই টাকা দিয়ে তাদের কিছুই হবে না। তবে সময়ক্ষেপণ হলেও পর্যায়ক্রমে সবাই টাকা পাবেন বলেও দাবি করেন তিনি।