বীমা খাতে তথ্য গোপন: ঝুঁকিতে গ্রাহক, চাপে কোম্পানি প্রকাশিত: ১:১৭ অপরাহ্ণ, মে ২৩, ২০২৬ নাদিরা ইসলামঃ এমএএস: বীমা হলো অনিশ্চয়তার সময়ে আর্থিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ব্যক্তি, পরিবার কিংবা ব্যবসা- সব ক্ষেত্রেই বীমা ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় আস্থার জায়গা তৈরি করে। কিন্তু এই আস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে তখনই, যখন বীমা পলিসি গ্রহণের সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা হয়। অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে বা অসচেতনতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লুকিয়ে রাখেন, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করে। সাম্প্রতিক সময়ে তথ্য গোপনের কারণে দাবি নিষ্পত্তি জটিল হয়ে পড়ার বহু ঘটনা সামনে আসছে, যা কেবল গ্রাহকের জন্য নয়, পুরো বীমা খাতের জন্যই উদ্বেগজনক। বীমা চুক্তির মূল নীতি এবং মূল ভিত্তি হলো “সর্বোচ্চ সদিচ্ছা” বা Utmost Good Faith। অর্থাৎ, বীমা গ্রহণকারীকে তার স্বাস্থ্য, আয়, পেশা, পূর্বের রোগ, দুর্ঘটনা বা অন্যান্য ঝুঁকিসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে জানাতে হয়। কারণ এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই কোম্পানি ঝুঁকি মূল্যায়ন এর মাধ্যমে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে বীমা পলিসি গ্রহণ করেন। কিন্তু অনেক সময় কম প্রিমিয়াম কিংবা সহজে পলিসি পাওয়ার উদ্দেশ্যে গ্রাহক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আড়াল করেন। এর ফল মারাত্মক হতে পারে। যখন দাবি উত্থাপনের সময় গোপন তথ্য প্রকাশ পায়, তখন বীমা কোম্পানি দাবি বাতিল করতে পারে। এতে গ্রাহক যেমন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন, তেমনি পরিবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। বিশেষ করে লাইফ বীমা বা স্বাস্থ্য বীমার ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা সামাজিক ও মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে। গ্রাহকের ক্ষতি ধরা যাক, একজন ব্যক্তি লাইফ বীমা নেয়ার সময় তার দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের তথ্য গোপন করলেন। কয়েক বছর পর তিনি হৃদরোগে মারা গেলে পরিবার বীমার দাবি উত্থাপন করল। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে তিনি আবেদনপত্রে রোগের তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে লুকিয়েছিলেন, তাহলে বীমা কোম্পানি দাবি প্রত্যাখ্যান করতে পারে। এতে পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে যায় এবং বীমা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। আবার স্বাস্থ্য বীমার ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেকে পূর্বের অস্ত্রোপচার বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের তথ্য গোপন করেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসার সময় কোম্পানি পুরোনো মেডিকেল রেকর্ড যাচাই করে দাবি বাতিল করে দেয়। ফলে যে আর্থিক সুরক্ষার আশায় বীমা নেয়া হয়েছিল, সেটিই অকার্যকর হয়ে পড়ে। কোম্পানির ক্ষতি তথ্য গোপন শুধু গ্রাহকের জন্য নয়, বীমা কোম্পানির জন্যও বড় সমস্যা তৈরি করে। কারণ কোম্পানি সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে। যখন কোনো গ্রাহক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেন, তখন কোম্পানি ভুল হিসাবের ওপর ভিত্তি করে পলিসি ইস্যু করে ফেলে। উদাহরণ হিসেবে, একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছেন, কিন্তু স্বাস্থ্য বীমা নেয়ার সময় তা গোপন করলেন। পরে বড় অঙ্কের চিকিৎসা ব্যয় দাবি করলে কোম্পানি তদন্ত ও আইনি জটিলতায় পড়ে। এতে কোম্পানির অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ে, সময় নষ্ট হয় এবং আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হয়। কেন এটি উদ্বেগজনক প্রথমত, তথ্য গোপন বীমা খাতে আস্থার সংকট তৈরি করে। সাধারণ মানুষ মনে করেন বীমা কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে দাবি পরিশোধ এড়িয়ে যায়। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমস্যার সূত্রপাত হয় ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য দেয়ার মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, এতে সৎ গ্রাহকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ কোম্পানিগুলো বাড়তি ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রিমিয়াম বাড়াতে পারে। ফলে পুরো খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তৃতীয়ত, এটি আইনি জটিলতারও জন্ম দেয়। অনেক দেশে বীমা আইনে তথ্য গোপনকে চুক্তিভঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশেও বীমা দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। বীমা কোনো প্রতারণার ক্ষেত্র নয়; এটি পারস্পরিক বিশ্বাস ও দায়িত্ববোধের সম্পর্ক। তাই তথ্য গোপন সাময়িক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ব্যক্তি, পরিবার ও পুরো অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য বীমা খাত গড়ে তুলতে হলে গ্রাহককে সত্য তথ্য দেয়া এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। বীমা করুন, সুরক্ষিত থাকুন। লেখক: সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব একচ্যুয়ারিয়াল ফাংশন, আকিজ তাকাফুল লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। SHARES অর্থনীতি বিষয়: