এআইয়ে ধরা পড়বে শেয়ারবাজারের কারসাজি

প্রকাশিত: ৭:৪৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

ফারজানা ফারাবী : শেয়ারবাজারে কারসাজি, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ জন্য দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) আগামী এক বছরের মধ্যে বর্তমান সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা এআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় রূপান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় কোনো শেয়ারের দাম বা লেনদেনে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা সতর্কবার্তা তৈরি হবে। প্রয়োজন হলে দ্রুত লেনদেন বন্ধ বা স্থগিত করার ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে। এতে নজরদারির গতি বাড়ার পাশাপাশি মানুষের সুযোগসন্ধানী হস্তক্ষেপ ও সম্ভাব্য পক্ষপাত কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে বাংলাদেশের বর্তমান বাজার অবকাঠামোয় এ ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে চালু করা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, শুধু এআই সফটওয়্যার স্থাপন করলেই স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকর হয় না। এর জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ নির্ভরযোগ্য ও তাৎক্ষণিক তথ্য, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারের মধ্যে সংযোগ, গ্রাহকের পূর্ণাঙ্গ কেওয়াইসি তথ্য, শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা ও দক্ষ জনবল।

এখন যেভাবে নজরদারি হয়

বর্তমানে ডিএসইর সার্ভিল্যান্স বিভাগ রিয়েল-টাইম বাজারতথ্য পর্যবেক্ষণ করে অস্বাভাবিক মূল্য ও লেনদেনের গতিবিধি শনাক্ত করে। গত জুন মাস থেকে প্রায় এক দশক পর রিয়েল-টাইম সার্ভিল্যান্সের ভিত্তিতে কয়েকটি কোম্পানির লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, শ্যামপুর সুগার মিলস ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পর সাময়িক লেনদেন বন্ধের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো শেয়ারে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছে স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য বা পিএসআই আছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। এরপর সন্দেহজনক লেনদেন বা কারসাজির ঘটনা ঘটেছে কি না, তা তদন্ত করা হয়। অর্থাৎ প্রযুক্তি প্রাথমিক সংকেত দিতে পারলেও চূড়ান্ত যাচাই ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে এখনো মানুষের ভূমিকা মুখ্য।

সম্প্রতি স্টার অ্যাডহেসিভসের শেয়ারে অস্বাভাবিক লেনদেন পরিলক্ষিত হওয়ায় ডিএসইর সার্ভিল্যান্স প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিএসইসি তদন্ত করে। তদন্তে সিরিজ ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের চাহিদা তৈরির অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় এফএ ট্রেডিং করপোরেশনকে জরিমানা করা হয়।

এআই এলে যা বদলাবে

সম্প্রতি ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) আয়োজিত এক উন্মুক্ত আলোচনায় বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে ডিএসইকে এআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থায় যেতে বলা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় ট্রিগারের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত এবং প্রয়োজনে দ্রুত লেনদেন বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, কার্যকর এআই সার্ভিল্যান্স শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা শনাক্তের পাশাপাশি আরও বহুমুখী বিশ্লেষণে সহায়তা করবে। এর মধ্যে লেনদেনের পরিমাণ ও ঘনত্ব, একই ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট একাধিক হিসাবের লেনদেনের ধরন, একই সময়ে কেনাবেচা, সম্ভাব্য ওয়াশ ট্রেড বা সার্কুলার ট্রেডিং, ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের সম্ভাব্য ধরন, ফ্রন্ট-রানিং, পাম্প অ্যান্ড ডাম্প ধরনের আচরণ এবং ব্রোকার বা অনুমোদিত প্রতিনিধির অস্বাভাবিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হবে।

এ ছাড়া কোনো কোম্পানির প্রকাশিত তথ্য এবং মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শেয়ারের লেনদেনের সম্পর্কও বিশ্লেষণ করবে এ ব্যবস্থা। অর্থাৎ এআই শুধু বাজারের মূল্য ও লেনদেনের তথ্য নয়, বাজারে অংশগ্রহণকারীদের আচরণ ও পারস্পরিক সম্পর্কের তথ্যও বিশ্লেষণ করবে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেওয়াইসি

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এআই সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থার অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ। এ বিষয়ে ডিএসইর একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান সার্ভিল্যান্স প্ল্যাটফর্মের প্রধান সমস্যা হলো এটি গ্রাহকের কেওয়াইসি তথ্যের সঙ্গে সমন্বিত নয়। অথচ কেওয়াইসি শনাক্তকরণ ছাড়া এআই চালু করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। এ জন্য আগে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল তৈরি করা জরুরি।

কারণ, কোনো এআই যদি শুধু এটি শনাক্ত করে যে কোনো শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, তাহলে সে কেবল প্রাথমিক সতর্কবার্তা দিতে পারবে। কিন্তু কারা ওই শেয়ার কিনেছে, তাদের মধ্যে কোনো সংযোগ আছে কি না এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী বা বেনিফিশিয়াল ওনারের (বিও) অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণে একাধিক হিসাব রয়েছে কি না—এসব জানতে হিসাবভিত্তিক তথ্য ও কেওয়াইসি প্রয়োজন।

ফলে প্রকৃত এআই সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ডিএসইর ট্রেডিং তথ্যের সঙ্গে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ও বিএসইসির প্রয়োজনীয় তথ্যের সমন্বয় করতে হবে। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিএসইসি বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারে গ্রাহকের হিসাব, লেনদেন ও সিকিউরিটিজ হোল্ডিংয়ের তথ্য পরিবর্তন বা গোপন করা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করছে।

এআই বসাতে যে অবকাঠামো প্রয়োজন

একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কার্যকর এআই সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কয়েক স্তরের অবকাঠামো প্রয়োজন। প্রথমত, রিয়েল-টাইম ডেটা অবকাঠামো। ডিএসইর প্রতিটি অর্ডার, লেনদেন, মূল্য, পরিমাণ ও সময়ের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ডেটা ইন্টিগ্রেশন। ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ও বিএসইসির প্রয়োজনীয় তথ্য নিরাপদ কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করতে হবে।

তৃতীয়ত, এআই ও মেশিন-লার্নিং মডেল। শুধু নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই সতর্কবার্তা দেওয়ার বদলে স্বাভাবিক লেনদেনের ধরন থেকে অস্বাভাবিক বিচ্যুতিও শনাক্ত করতে হবে।

চতুর্থত, সতর্কবার্তা ও তদন্তের সমন্বিত ব্যবস্থা। এআই কোনো হিসাব বা শেয়ারকে সন্দেহজনক হিসেবে শনাক্ত করার পর কর্মকর্তারা যেন একই প্ল্যাটফর্ম থেকে সংশ্লিষ্ট লেনদেন, হিসাব, মালিকানা ও কোম্পানির তথ্য দেখতে পারেন।

পঞ্চমত, সাইবার নিরাপত্তা ও অডিট ট্রেইল। এআই কোনো লেনদেনকে কেন সন্দেহজনক হিসেবে শনাক্ত করেছে এবং এরপর কোন কর্মকর্তা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড রাখতে হবে।

পুরোপুরি এআইনির্ভরতা নিয়ে ঝুঁকি

এআই ব্যবহারের অন্যতম উদ্দেশ্য মানুষের হস্তক্ষেপ কমানো হলেও মানুষকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে ভুল সিদ্ধান্তের জন্ম দিতে পারে। কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম দ্রুত বেড়ে গেলে এআই সেটিকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। কিন্তু সেই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে যদি প্রকৃত ব্যবসায়িক কারণ থাকে, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেনদেন বন্ধ করে দিলে স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আবার কারসাজি যদি কৌশলে ধীরে ধীরে অথবা একাধিক ভিন্ন হিসাব ব্যবহার করে করা হয়, তবে তা নির্ধারিত প্যাটার্নের বাইরে থেকেও ঘটতে পারে। ফলে এআই ব্যবস্থায় যেমন ভুলভাবে স্বাভাবিক লেনদেনকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করার বা ‘ফলস পজিটিভ’-এর ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি প্রকৃত কারসাজি এড়িয়ে যাওয়ার বা ‘ফলস নেগেটিভ’-এর সুযোগও থাকে।

এ কারণে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাটি হবে—এআই সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করবে, আর অভিজ্ঞ বিশ্লেষক বা কর্মকর্তা তা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।

ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ার বলেন, এআইয়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত বাজার বিশ্লেষকদের কাজে সহায়তা করা, তাঁদের পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা নয়। নজরদারি জোরদারের অংশ হিসেবে ডিএসই এআইভিত্তিক সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থার দিকে যাবে, যাতে অস্বাভাবিক লেনদেন দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক সংকেত বা ‘রেড ফ্ল্যাগ’ তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে এআই মানুষের জায়গা পুরোপুরি নেবে না; বরং বিশ্লেষকদের কাজকে সহায়তা করবে।

বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি ও সুবিধা

এআই সার্ভিল্যান্স কার্যকর হলে বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত সতর্কবার্তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে রিয়েল-টাইম সার্ভিল্যান্সের মাধ্যমে সন্দেহজনক শেয়ারের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অনভিপ্রেত ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা কমবে।

তবে একই সঙ্গে নতুন কিছু ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। যেমন, ভুল সংকেতের কারণে স্বাভাবিক লেনদেন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অতিরিক্ত স্বয়ংক্রিয়তার ফলে প্রতিটি সতর্কবার্তার পর হুটহাট লেনদেন বন্ধ করা হলে বাজারে অপ্রয়োজনীয় অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। আবার অসম্পূর্ণ বা পুরোনো কেওয়াইসি তথ্য এআইয়ের বিশ্লেষণকে দুর্বল করে দিতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে সাইবার হামলা এবং এআই মডেলে ব্যবহৃত পুরোনো তথ্যের কোনো অ্যালগরিদমগত পক্ষপাত নতুন ব্যবস্থায় বহাল থাকার ঝুঁকি।

প্রযুক্তির চেয়েও বড় বিষয় তথ্যের সংযোগ

একটি শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে এআইভিত্তিক সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা চালু করা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হলেও এটিকে শতভাগ কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা বেশ চ্যালেঞ্জিং। কেবল সফটওয়্যার স্থাপন নয়; বরং ডেটা ইন্টিগ্রেশন, কেওয়াইসি সংযোগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সাইবার নিরাপত্তা, মডেল যাচাই ও দক্ষ মানবসম্পদ—সব বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ।

তার মতে, এআই কতটা উন্নত, কেবল তার ওপর নির্ভর করলেই নজরদারির প্রকৃত কার্যকারিতা মিলবে না। বরং বাজারের তথ্য কতটা দ্রুত, নির্ভুল ও পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত করা যাচ্ছে এবং এআই শনাক্ত করা সন্দেহজনক লেনদেনের বিরুদ্ধে কত দ্রুত ও যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে—সেটিই হবে চূড়ান্ত সাফল্যের চাবিকাঠি।