বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম

প্রকাশিত: ৪:০২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

ফারজানা ফারাবী : জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বাড়ল। লিটার প্রতি ২০ টাকা করে বেড়েছে। আজ সোমবার (২১-০৯-২৬)ইং থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা করা হয়েছে। দেশে জ্বালানি তেলের দামের ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ রোববার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থ বিবেচনায় দেশের বাজারে পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি। সরকারের এই সিদ্ধান্তে পরিবহন ও কৃষির পাশাপাশি শিল্প ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সর্বশেষ সমন্বয়ের পর ডিজেলের দাম ছিল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২, পেট্রোল ১১৬ এবং অকটেন ১২০ টাকা। এরপর ধাপে ধাপে দাম বাড়ানো হয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়ও এসব দামই কার্যকর ছিল। ১৯ এপ্রিল থেকে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮, পেট্রোল ১৯ এবং অকটেন ২০ টাকা বাড়ানো হয়। এতে দাম দাঁড়ায় যথাক্রমে ১১৫, ১৩০, ১৩৫ ও ১৪০ টাকা। এরপর জুনে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম আরও পাঁচ টাকা করে বাড়ানো হয়। ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। জুনের দামই জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে বহাল ছিল। এবার চার ধরনের জ্বালানির দামই একসঙ্গে ২০ টাকা করে বাড়ানো হলো। ফলে ফেব্রুয়ারির দামের তুলনায় ডিজেলের দাম ৩৫ টাকা, কেরোসিন ৪৩, পেট্রোল ৪৪ এবং অকটেন ৪৫ টাকা বেড়েছে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৪৪ টাকা থেকে বেড়ে ১০৬ টাকা ৭৫ পয়সা হয়েছিল। অর্থাৎ দাম বেড়েছিল ১৪২ শতাংশ। একই সময়ে পেট্রোলের দাম ৭৪ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকা এবং অকটেনের দাম ৭৭ টাকা থেকে বেড়ে ১২৭ টাকা হয়েছিল। এ দুটি জ্বালানির দাম বেড়েছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ।
২০২২ সালের ৫ আগস্ট চার ধরনের জ্বালানির দাম এক লাফে ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। ওই সময় অকটেনের দাম ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং পেট্রোলের দাম ৫১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছিল। এর আগে ২০২১ সালের নভেম্বরে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানো হয়। ২০২৪ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় মাসিক মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিলিয়ে কয়েক দফা জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়। সেপ্টেম্বরে অকটেন ও পেট্রোলের দাম ছয় টাকা এবং ডিজেল ও কেরোসিনের দাম এক টাকা ২৫ পয়সা কমানো হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চার ধরনের তেলের দাম এক টাকা করে বাড়ানো হলেও জুনে ডিজেলের দাম দুই টাকা এবং পেট্রোল ও অকটেনের দাম তিন টাকা করে কমানো হয়। ডিসেম্বরে আবার চার ধরনের তেলের দাম দুই টাকা করে বাড়ানো হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে আরও দুই দফায় লিটারপ্রতি দুই টাকা করে কমানো হয়েছিল।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে বিপিসির বড় অঙ্কের লোকসানের কথা বলা হয়েছে। বিপিসির হিসাবে, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৪ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের একই মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা।
মে মাসে গত বছরের ৪ হাজার ১৮২ কোটি টাকার আমদানি ব্যয় বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। আগস্টে ২ হাজার ৭৪০ কোটি ৬২ লাখ টাকা থেকে আমদানি ব্যয় বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির নিজস্ব তহবিলের লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে এপ্রিলে লোকসান হয়েছে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি এবং জুনে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে লোকসান পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।

আমদানি ব্যয় মেটাতে চলতি বছর ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নিয়েছে বিপিসি। বর্তমানে ব্যাংক হিসাবে রয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। অথচ দুই মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতে প্রয়োজন প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।

এ পরিস্থিতিতে গত ৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে চিঠি দেয় বিপিসি। সেখানে মার্চ থেকে আগস্টের লোকসানের অর্থ সরকারি সহায়তা হিসেবে দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত শুল্ক-কর কমানো বা প্রত্যাহারের প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
এরপর বিপিসির অর্থসংকট নিয়ে গত সপ্তাহে সরকারের উচ্চপর্যায়ে বৈঠক হয়। সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে বিপিসিকে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে ডিজেলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এতে প্রতিদিন লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানো হলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।