সমস্যা সংকুল দেশের বীমা খাত সমাধানে ত্বরিত ব্যবস্থা জরুরী প্রকাশিত: ৯:০৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১, ২০২৫ বীমা বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকঃ দেশের বীমাখাত নিয়ে কেউ ভাবেন কিনা, ভাবলে বীমা খাতের অবস্থা সঠিকভাবে উপলব্ধি করেন কিনা তা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। কারণ ব্যাংকগুলোর বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর যেভাবে সর্বব্যাপী তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে, তা সত্যিই স্বৈরাচার কর্তৃক ধ্বংস করা ব্যাংক খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা হিসেবে সর্বমহলে সমাদৃত হয়েছে এবং তা চলমান রয়েছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। ব্যাংক ও বীমা খাতকে পরস্পরের সম্পূরক ও পরিপূরক বিবেচনা করা হয়। কিন্তু দেশের ব্যাংক খাতের চেয়ে বীমাখাতের লোকবল গ্রাহক সংখ্যা সংগৃহীত আমানত মিলে বলয় ও পরিধি অনেক বড়। অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হওয়ার পর বিগত স্বৈরাচারী সরকারের ছত্রছায়ায় বীমা খাতে যতসব অনিয়ম দুর্নীতি লুটপাট ও তুঘলকী সব কারবার হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে কোন পদক্ষেপ ব্যাংক খাতের মত দৃশ্যমান হয়নি। যার ফলে বীমাখাত চরম অচলায়তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এ খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে হতাশার জন্ম দিয়েছে। বীমা খাতের মাফিয়ারা এখনো বহাল তবিয়তে আছে। যাদের নামে স্বৈরাচারের দোসর ও সহযোগী হিসেবে পরিষ্কার পরিচিতি আছে। বীমাখাত দুটি ধারায় বিভক্ত। লাইফ বা জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান ৩৬টি, নন-লাইফ (জেনারেল) সাধারণ বীমা খাতে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪৬টি, হিসাব করলে দেখা যায় ৩য় ও চতুর্থ প্রজন্মের লাইফ খাতে ২৫টি আওয়ামীলীগ সরকার অনুমোদন দিয়েছে, যেগুলোর প্রতিটি আওয়ামীলীগ রাজনৈতিক পরিচিতির মাধ্যমে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। নন-লাইফ বীমাখাতে ৩০টি বীমা কোম্পানির অনুমোদন বিগত সরকার আওয়ামী পরিচয়ে অনুমোদন প্রাপ্ত হয়। দেশের ভৌগোলিক সীমা ও জনসংখ্যা এবং ব্যবসা বাণিজ্যের হিসাবে দেশে বীমা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক বেশী। বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আওয়ামী রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় এসব প্রতিষ্ঠান অনুমোদন লাভ করে। বিগত ১৭ বছর এবং আওয়ামীলীগের ৯১-৯৬ মেয়াদে বীমা খাতকে আওয়ামীলীগের আধিপত্য তৈরির এবং অনুমোদনে ব্যাপক আর্থিক সুবিধা লাভ করার জন্য এখাতকে বেছে নেয়া হয়েছে। ফলে অন্যান্য খাতের মত এখাতে সংস্কার ও নানা বৈষম্য দূর করার জন্য কোন ব্যবস্থা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গ্রহণ করার নমুনা নেই বললেই চলে। বীমা খাতের সাথে সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থা গুলোর মধ্যে আইডি আর এ, বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ সম্পৃক্ত। বিগত সরকারের আমলে এ সংস্থা গুলো দলীয়করণের কারণে এর প্রভাব বীমা প্রতিষ্ঠানের উপর বর্তিয়েছে। ফলে চরম বিশৃঙ্খলাতে এবং দুর্নীতির রকমফেরে বীমাখাত আজ তলানীতে চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, নাম মাত্র চিঠি চালাচালি ও মিটিং সিটিং ছাড়া এ খাতের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ অর্থমন্ত্রনালয় কি ব্যবস্থা নিয়েছে তা জনগনের জানার অধিকার আছে। বীমা খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় আছে জীবন বীমাখাত। জীবন বীমা খাতে ২০ লক্ষ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহের জন্য জড়িত। বর্তমানে তারা এখাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এ খাত ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। মেয়াদোত্তর দাবী ও মৃত্যু দাবীর কয়েক হাজার কোটি বকেয়া রয়েছে। যার পাওনা দারের সংখ্যা এক কোটির বেশি হবে। দু’একটি প্রতিষ্ঠান বাদে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন শত শত ধরণা দেয়া এবং বাগবিতণ্ডা চলছে হার হামেশা। তাদের মধ্যে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা হাহাকার করছে। অনেকে কান্নাকাটি করতে দেখা যায়। বার বার ঢাকায় আসতে যেতে তাদের আরও সর্বশান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। নিরীহ এসব মানুষ কার কাছে প্রতিকার পাবে তা কেউ বলতে পারছে না। বিগত সরকারের সময় সরকারি বলয়ে পাওনা পরিশোধের পরিবর্তে আওয়ামী করণের মহোৎসব ছিল। দেনা পরিশোধের পরিবর্তে আওয়ামী লীগের ম্যানেজকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যাতে করে প্রতি বছর দেনা জমা হতে হতে প্রায় ১৫ বছরে কোম্পানীগুলোতে গ্রাহকের পাওনার পাহাড় তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার বা অর্থমন্ত্রনালয় এ বিষয় জানেন কিনা তা নিয়ে রীতিমত জনগণ প্রশ্ন তুলছে। তাছাড়া আওয়ামী আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা মানুষের ডিম ও মুরগি বিক্রির প্রিমিয়ামের টাকা লোপাট করা হয়েছে। এ বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা তা জনগণ জানতে চায়। সেখানে মানুষ দশবছরের বেশি সময় ধরে পাওনা টাকার জন্য হাহাকার করছে। বার বার তারা বলছে এ টাকা আমরা আদৌ পাবো কিনা। এ অবস্থার ফলে এখন জনগণের মধ্যে বীমার বাজারজাতকরণে নিয়োজিত জনশক্তির জন্য কাজ করা দুরহ হয়ে পড়ছে। বহুবীমা কর্মী ঘর বাড়ি/ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। অহরহ হেনস্তা হচ্ছে পাওনাদার গ্রাহকদের হাতে। এ অবস্থার অবসানের জন্য বৈপ্লবিক কোন অবস্থা অন্যান্য খাতের মত কোন কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না তার জবাব দরকার বলে সংশ্লিষ্ট জনেরা মনে করে। বীমা খাতের বড় বৈষম্যের স্বীকার ইসলামী বীমা। ইসলামী বীমার সূচনা হয় বাংলাদেশে ২০০০ সালে। এ দু’যুগের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও কর্তৃপক্ষীয় কোন ব্যবস্থা ইসলামী বীমার জন্য করা হয়নি। নামে ইসলামী বীমা চালু করে মানুষের ধর্মীয় আবেগ ও অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে (প্রিমিয়াম) আমানত তা ফেরতের পরিবর্তে চরম ধৃষ্টতার মাধ্যমে অর্থ লোপাট করা হয়েছে। দেশের প্রচলিত আইন কানুন যেন বীমা খাতের জন্য কাজে আসছে না। ইসলামী বীমার জন্য বীমা আইন ২০১০ সালে সংজ্ঞা ও পরিচালনা গত দু’টি উপধারা ব্যতিত কোন আইনী কাঠামো নেই। কোন বিধিমালা ছাড়া এই ইসলামী বাংলাদেশ চলছে। ফলে হারাম ও হালালের পার্থক্য করার জন্য বাস্তবে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। গত সরকারের ১৫ বছরের ইসলামী বীমার নাম চললে বলা হতো জঙ্গি ও রাজাকার। ফলে ইসলামী বীমার জন্য কোন কাজ কেউ করেনি। চমকে ওঠার মতো বিষয় হচ্ছে, ইসলামী খাত মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে গেছে। ১৩টি জীবন বীমা কোম্পানী পূর্নাঙ্গ ইসলামী বীমা, উইং/উইন্ডো খুলে পরিচালিত হচ্ছে ২৫টি বীমা কোম্পানী। সাধারণ বীমা খাতে ৫টি কোম্পানী পূর্ণাঙ্গ এবং ১৫টি কোম্পানীতে ইসলামী বীমার উইং রয়েছে। ইসলামী বীমায় গ্রাহকের সংখ্যা দুই যুগে প্রায় কোটির কোঠায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলামী বীমায় প্রায় ৭/৮ লক্ষ লোক কাজ করছে। অথচ ইসলামী বীমার জন্য মন্ত্রণালয়, আইডি আর এ বাংলাদেশ ব্যাংক সহ সংশ্লিষ্ট কোন প্রতিষ্ঠানে বিভাগ এমনকি ডেস্কও নেই। প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে চলে দেশের ইসলামী বীমা প্রতিষ্ঠান গুলো। আইন কানুনের কোন বালাই বলতে নেই। যার যেমন খুশি কার্যক্রম চালাচ্ছে। কোন গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরণের অবস্থা চলতে পারে না। প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের এমন নজীর বোধ হয় বাংলাদেশের অন্য কোন খাতে নেই। মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে ইসলামী বীমা নিয়ে সঠিক জানা বুঝার মাধ্যমে কাজ করার কোন জনশক্তি আছে বলে মনে হয় না। ২০১০ সালে আইডি আর এ গঠিত হওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল যে, যেহেতু আইনে ইসলামী বীমা খাতকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে সেহেতু আইডি আর এ ইসলামী বীমার জন্য নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করবে। এর মধ্যে ইসলামী বীমার উন্নয়নে বিশ্ব ব্যাংকের প্রকল্প পরিচালিত হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত ইসলামী বীমার পরিচালনার জন্য আইডি আর এ একটি বিধিমালা দ্বারা আইনী কাঠামো উপহার দিতে পারেনি। ফলে গণমানুষের মধ্যে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকার পাশাপাশি ইসলামী বীমার প্রতি অবহেলা ও বৈষম্যের কারণে এক ধরণের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। যা দূর করার জন্য ব্যবস্থা নেয়া সময়ের দাবী। স্বৈরাচারের ১৫ বছরে বীমা খাতের সংগঠন ও এ্যাসোসিয়েশন দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক কোন ভাবধারা ছিল না। জোর যার মুল্লুক তার অবস্থার সাথে দলীয় নাম ভাঙ্গিয়ে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। এসব সংগঠন ও এ্যাসোসিয়েশন বীমা খাতের কল্যাণ ও অবদান রাখার জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করা অতীব প্রয়োজন। সরকারী তদারকির ব্যবস্থা থাকা দরকার। মন্ত্রনালয়ের এখানে নজর দেয়া জরুরী। বীমা খাতে শিক্ষিত লোকেরা আসতে চায় না। বর্তমান প্রজন্মের গ্রাজুয়েটরা এখানে কাজ করতে রাজী না। এর জন্য কিছু স্বার্থান্বেষী মহল দায়ী। বীমা খাতে এমডি বা মুখ্য নির্বাহীর অভাব। এটি মহল বিশেষের স্বার্থে এমন অবস্থা তৈরি করা হয়েছে। মুখ্য নির্বাহীদের মধ্যে গুটিকয়েক ছাড়া প্রায় জোড়া তালির ডিগ্রী বা এসএসসি অথবা এইচএসসি পাশ করার পর ডিগ্রী ম্যানেজ করে মুখ্য নির্বাহী হিসেবে নিয়োগ লাভ করেছে। অথচ শিক্ষিত লোকদের নানা আইন কানুনের দোহাইতে দূরে রাখা হচ্ছে। এককথায় বলতে গেলে শিক্ষিত লোকদের এখানে টিকে থাকার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ অনুমোদন এবং অস্বচ্ছ কাজ করার কারবারের কারণে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর চলাকালীন সময়ের চেয়ে অধিকতর খারাপ বলে আইডিআরএ’এর কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতার বিষয়ে প্রশ্ন তুলছে। অধিদপ্তর ভালো ছিল বলে মন্তব্য করছে!! বীমা খাতের বলয় বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ করা হলো। লোকবল নিয়োগ দেয়া হলো। যদিও খাত অনুযায়ী আরও লোক দরকার। তবুও যদি কর্তৃপক্ষের অবস্থা ঠুটো জগন্নাথের মতো হয় তাহলে এখাতের উন্নতির আশা করা যাবে কিভাবে? এপ্রশ্ন এখন সর্বত্র। অন্তর্বর্তী সরকারের এখানে নজর দেয়া উচিত। দলীয়করণের নামে এখানে গত ১৫ বছর যে বেসামাল অবস্থা চলেছে তাতে আইনের কোন প্রয়োগ ছিল না, আঃলীগের তকমা লাগালে সব ঠিক হয়ে যেত। প্রশ্ন হচ্ছে সব খাতে যদি আওয়ামী করণের মূলোৎপাটনের জন্য কমিটি/কমিশন হতে পারে এখাতের জন্য কেন হবে না। এখনও যদি অবহেলা ও অব্যবস্থাপ্পার মধ্যে থেকে যায়, দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া উপায় কি? বীমা খাতের অনিয়ম দুর্নীতির ওপর রীতিমত শ্বেতপত্র প্রকাশ করার উপাদান আছে। লিখে এটা শেষ করা যাবে না। তাই এখাতের সংস্কার কল্পে কিছু প্রস্তাবনা পেশ করছি। ১। বিগত ১৫ বছরের দলীয়করণের মাধ্যমে যে অনিয়ম ও দুর্নীতির মহোৎসব চলেছে এর জন্য একটি কমিশন গঠন করে প্রতিটি লাইফ ও নন-লাইফ কোম্পানীতে তদন্ত করা জরুরী। যেখানে অভ্যন্তরীণ তদন্তের পাশাপাশি স্টেকহোল্ডারদের থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। কারণ বীমা খাতের তদন্ত অর্থের মাধ্যমে ধামাচাপা হয়ে যায় বলে কথিত আছে। ২। সরকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। গতানুগতিক ভাবে কাজ চলতে থাকলে বীমা খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এখানে আইনের কাঠামোর পাশাপাশি প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন বিষয়ে জোর দিতে হবে। কঠোর অবস্থানে না গেলে এখাতের বিশৃংখলা দূর করা সম্ভব নয়। ৩। স্বৈরাচারী আমলে কোম্পানিগুলোতে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। যেমন জোর করে বোর্ড গঠন করা ও কোম্পানী হাইজ্যাক করা, জোর করে চেয়ারম্যান হওয়া সহ যাবতীয় অনিয়ম ও দুর্নীতির বিচার করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে এসব তুঘলকি কান্ড কেউ করতে না পারে। ৪। ইসলামী বীমার জন্য অন্যান্য দেশের আদলে পৃথক বিভাগ সব প্রতিষ্ঠানে চালু করার ব্যবস্থা করতে হবে। ইসলামী বীমার তত্ত্বগত ও ব্যবহারিক জ্ঞান সম্পন্ন লোকদের সমন্বয়ে একটি সমৃদ্ধ কার্যক্রম গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে। ৫। বীমাখাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির ওপর তদন্ত করে একটি রিপোর্ট শ্বেতপত্র আকারে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করা উচিত। যাতে আগত দিনে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এতে জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে এবং বীমা ব্যবসার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে। ৬। এ খাতের সকল কোম্পানীর জন্য একই ধরণের প্লান/প্রোডাক্ট এবং লোকবল নিয়োগে একটি ইউনিফরমেটিভ পদ্ধতি অনুসরণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। উন্নয়ন ও ডেস্ক সকলকে আইন ও বিধির অধীনে আনতে হবে। ৭। এ খাতের সংগঠন, এ্যাসোসিয়েশন ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সংস্কার আনতে হবে। গণতান্ত্রিক অবস্থার বাস্তবায়ন করতে হবে। যুগের পর যুগ কোন ব্যক্তি কর্তৃক কোন প্রতিষ্ঠান কুক্ষিগত করে রাখার প্রবণতা দূর করতে হবে। ৮। শিক্ষিত ও মেধাবী লোকদের এ খাতে আসার জন্য ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। অশিক্ষিত অর্ধ-শিক্ষিত লোকদের দৌরাত্ম থেকে এ খাতকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। ৯। ৪/৫টি কোম্পানী ছাড়া বাকি সব জীবন বীমা কোম্পানীর মেয়াদোত্তর বীমা দাবী, মৃত্যু দাবী ও অন্যান্য দাবী মিলিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া দ্রুত গ্রাহকদের মাঝে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করা জরুরী। কারণ এ যাবতকালে বছরের পর বছরের গরীব অসহায় গ্রাহকরা ঘুরাঘুরি করার পর আকাশের দিকে তাকিয়ে কান্নাকাটি করে আকাশ বাতাস ভারি করে তুলছে। সরকার, কর্তৃপক্ষ সহ বীমা কোম্পানীর প্রতি অভিশাপ দিচ্ছে। তাদের দেনা পরিশোধ না করে যত কিছুই করা হউক তাতে আল্লাহর পক্ষ থেকেই উন্নতি ও অগ্রগতি হবে না। এটা বিবেচনায় রেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। ১০। সরকারী রাজস্ব আইনে জীবন বীমার প্রিমিয়াম আয়করযুক্ত। অথচ সরকারীভাবে আওয়ামী আমলে অতিরিক্ত ভ্যাট+ট্যাক্স আরোপ করে কর্মীদের থেকে ৫% ট্যাক্স+ভ্যাট কর্তন করা হয়, যা কোন ভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। অপরদিকে লভ্যাংশের ৩৫% অর্থ রাজস্ব খাতে ট্যাক্স হিসেবে জমা বাধ্যতামূলক। এতে করে লাভের ৯০% যেহেতু গ্রাহক পায় তাদের বড় অংশ এভাবেই সরকারী কোষাগারে চলে যায়। যা গরীব গ্রাহকদের বেলায় (অত্যন্ত) অমানবিক। এ বৈষম্য দূর করে যুক্তিযুক্ত হার আরোপ করতে হবে। ১১। বিগত সরকারের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী মোস্তফা কামালের সময়কালে আইডি আর এ এর চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান পাটোয়ারী ইউএমপি সফটওয়্যার করার নামে বীমা কোম্পানীগুলো থেকে বাধ্যতা মূলকভাবে টাকা কর্তন করা হচ্ছে। এ যাবতকালে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বেশি টাকা সংগ্রহ হলেও এ টাকা সার্ভিস দেয়ার নাম করে এটাকার সিংহভাগ আওয়ামী খরানার একটি প্রতিষ্ঠান খেয়ে ফেলছে। আইডি আর এ তাদের উদ্যোগে যদি এ কাজটি করে থাকেন, তাহলে কোম্পানীগুলো কেন এতটাকা প্রদান করবেন। এটি বাতিল করে বিকল্প কোন ব্যবস্থা করা দরকার। আওয়ামী আমলের এ রহস্যজনক ব্যবস্থা চলতে পারে না এ মর্মে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। একইসাথে এ বিষয়ে এ টাকার ব্যাপারে তদন্ত হওয়া জরুরী। ১২। ইসলামী বীমার জন্য সুদমুক্ত করার বিষয়টি মুখ্য। যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকে বাধ্যতামূলক ভাবে সরকারী বন্ড কেনার জন্য ৩০% শতাংশ প্রিমিয়ামের এফডিআর (বিজিটিবি) করার আইন রয়েছে। ইসলামী বীমার ক্ষেত্রে এটি মহাসমস্যা। এর বিকল্প বের করে এ বিধান বাতিল করা না হলে ইসলামী বীমার গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এর যৌক্তিক সমাধান দরকার। আমার জানা নেই, এ লেখা পড়ে কেউ ব্যবস্থা গ্রহণে এগিয়ে আসবেন কিনা। বলা বাহুল্য বীমা খাত দেশের অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি। একে দুর্বল রেখে সামগ্রিক কল্যাণ সম্ভব নয়। লাইফ ও নন-লাইফ দু’টোর প্রতি নজর দিতে হবে। স্বৈরাচার গত ১৫ বছর এবং আগের ৫ বছর মোট ২০বছরে বীমা খাতকে সবচেয়ে বেশি ধ্বংস করেছে। ফলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কমবেশি দুর্নীতি ও অনিয়ম আছে। অপরদিকে ইসলামী বীমা বিশ্বব্যাপী এখন বাস্তবতা। আর এতগুলো প্রতিষ্ঠান, জনশক্তি, গ্রাহকদের স্বার্থ, সর্বোপরী, আল্লাহর নিকট জবাবদিহির কথা বিবেচনায় রেখে ইসলামী বীমার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের অন্য সবখাত যদি সংস্কার হয়, তাহলে কেন দেশের বীমা খাত, তথা ইসলামী বীমার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়না যদি দৃশ্যত কিছু করা না হয় তাহলে বলতেই হবে শষ্যের ভেতর অবশ্যই ভূত লুকায়িত আছে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্রজনতার বিপ্লবের শহীদদের প্রতি এটা হবে বিশ্বাস ঘাতকতার শামিল। আর এটাও ঠিক, যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়া হয় তাহলে অবহেলিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত বিপুল সংখ্যক মানুষেরব স্বপ্রণোদিত আন্দোলনের মাধ্যমে আরেক ধরণের বিষ্ফোরণ হতে পারে। যেকারণেই সময় থাকতেই এত লেখা দ্বারা দৃষ্টি আকর্ষণ করা। সংশ্লিষ্টদের দ্রুত ব্যবস্থাই এর একমাত্র সমাধান। আর তার জন্য মনে হয় এখনই উত্তম সময়। লেখকঃ ড. আ. ই. ম. নেছার উদ্দিন বীমা ও শরীয়াহ বিশেষজ্ঞ এবং গবেষক SHARES অর্থ নিউজ বিষয়: