ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণের আওতায় আনতে হবে: অর্থমন্ত্রী প্রকাশিত: ৯:১৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬ নিজস্ব প্রতিনিধি : দেশের ক্ষুদ্র, কুটির ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের অর্থনীতির মূলধারায় আনতে তাদের ঋণের আওতায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, শুধু ঋণ দিলেই হবে না, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্যের মানোন্নয়ন, নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণেও সহায়তা দিতে হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখা সম্ভব হবে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) মাইক্রোফাইন্যান্স অ্যান্ড মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ ফান্ড প্রকল্পের উদ্বোধন ও ঋণ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মাইক্রোফাইন্যান্স অ্যান্ড মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ ফান্ড ৫০ কোটি টাকা দিয়ে একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হয়েছে। দেশের শিক্ষিত, কম শিক্ষিত ও হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে থাকা সৃজনশীলতা ও উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহকে কাজে লাগানোই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। অনেক মানুষ ব্যাংকে যেতে ভয় পান কিংবা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তাঁদের প্রবেশাধিকার নেই উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, তাঁদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করাই এ ধরনের উদ্যোগের উদ্দেশ্য। দীর্ঘদিন ধরে এনজিওগুলো মাইক্রোক্রেডিট কর্মসূচির মাধ্যমে এ ধরনের মানুষের কাছে ঋণ পৌঁছে দিচ্ছে। তবে নতুন প্রকল্পটি ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ব্যাংকের মূলধন ও সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির অর্থ ব্যবহার করে উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করা সম্ভব হবে। অনুদানের চেয়ে ঋণের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের দায়বদ্ধতা বেশি থাকে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনুদানের টাকা অনেক সময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না। কারণ টাকা ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকলে বিনিয়োগে দায়বদ্ধতা তৈরি হয় না। অন্যদিকে ঋণের সঙ্গে একটি খরচ বা সুদ যুক্ত থাকায় উদ্যোক্তার মধ্যে সেই অর্থ কাজে লাগিয়ে আয় করার তাগিদ তৈরি হয়। যেকোনো টাকার যদি একটি ‘কস্ট’ না থাকে, সেখানে কারও ইনসেনটিভ থাকে না। কস্ট থাকলেই ইনসেনটিভ তৈরি হয়। উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে সঠিক মানুষ চিহ্নিত করা এবং তাঁদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে ঋণগ্রহীতাদের প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ মৃৎশিল্প, তাঁত, কাঁসাসহ ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত বহু পরিবার তিন-চার প্রজন্ম ধরে একই কাজ করে আসছে। কিন্তু তাঁরা তাঁদের কাজকে আরও উন্নত পর্যায়ে নিতে পারছেন না। এসব মানুষকে শুধু ঋণ দিলেই হবে না; দক্ষতা উন্নয়ন, নকশা ও ব্র্যান্ডিংয়ের সহায়তাও দিতে হবে। একটি পণ্যের নকশা ও মান উন্নত করা গেলে তার বাজারমূল্য কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১০০ টাকার একটি পণ্য দক্ষতা উন্নয়ন, ভালো কাঁচামাল, নকশা ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব। গ্রামীণ ও সৃজনশীল এসব পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, অ্যামাজন, আলিবাবা ও ই-বে’র মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলাদেশের গ্রামীণ ও সৃজনশীল পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাজারজাত করা সম্ভব। এ কারণেই সরকার ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ নিয়ে কাজ করছে। এর আওতায় উদ্যোক্তাদের ঋণের পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, নকশা ও ব্র্যান্ডিংয়ের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ডিজাইনারদের একটি পুলও তৈরি করা হয়েছে। সৃজনশীল অর্থনীতির পরিধি শুধু প্রচলিত হস্তশিল্পে সীমাবদ্ধ নয় বলে উল্লেখ করেন আমির খসরু। গান, সংগীত, থিয়েটার, চলচ্চিত্র, ওটিটি, ফুড ও কুলিনারি শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রকে অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘মিউজিকের কোনো বাউন্ডারি নাই।’ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গান এখন মানুষ শুনছে। কোরিয়ান পপসহ বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক পণ্য বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের প্রতিভাবান শিল্পী ও সৃজনশীল মানুষদের সহায়তা করে তাঁদের কাজকে বৈশ্বিক পণ্যে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে। দেশের গ্রামীণ গান ও লোকজ সংস্কৃতিকে দীর্ঘদিন ধরে যথাযথভাবে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এখন এসব সম্পদকে ‘মনিটাইজ’ করার উদ্যোগ নিতে হবে। একজন সাধারণ মানুষের গাওয়া গান জনপ্রিয় হয়ে শত কোটি টাকার পণ্যে পরিণত হতে পারে। আইসিটি খাত ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত তরুণদেরও এ উদ্যোগের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, এসব খাতে থাকা প্রতিভাকে পণ্যের মূল্যশৃঙ্খলে যুক্ত করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উপযোগী করে তুলতে হবে। নিজের থাইল্যান্ড সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, সেখানে ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রডাক্ট’ মডেলের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের তৈরি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গ্রামের মানুষ বাড়িতে পণ্য তৈরি করলেও সরকার তাঁদের কাঁচামাল, দক্ষতা উন্নয়ন, নকশা ও ব্র্যান্ডিংসহ বিভিন্ন সহায়তা দেয়। পরে প্রস্তুত পণ্য সংগ্রহ করে বিমানবন্দরের মাধ্যমে সরাসরি বিশ্ববাজারে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের সমন্বিত সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। অনুষ্ঠানে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এই হার আরও কমিয়ে ১ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা উচিত। এতে ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়বে। মাইক্রোফাইন্যান্স অ্যান্ড মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ ফান্ডের ৫০ কোটি টাকার পাইলট প্রকল্প সফল হলে ভবিষ্যতে এতে আরও অর্থায়ন করা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রকল্পটি সফল হলে এর পরিধি আরও বাড়ানো হবে। এতে ব্যাংকের কার্যক্রম ও মুনাফা বাড়বে এবং আরও বেশি উদ্যোক্তাকে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন করা গেলে শুধু তাঁদের জীবনযাত্রার মানই পরিবর্তন হবে না, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসাকে সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখতে হবে। News PhotoCard SHARES অর্থনীতি বিষয়: