প্রাইম ইসলামী লাইফে ৫৬৫ কোটি টাকার বেশি অনিয়ম

প্রকাশিত: ৩:২৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিনিধি : দেশের প্রথম সারির জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ৫৬৫ কোটি টাকার বেশি আর্থিক অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন ও অনিশ্চিত বিনিয়োগের চিত্র উঠে এসেছে। কোম্পানিটির ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষা করে এসব তথ্য জানিয়েছেন নিরীক্ষকেরা। এর মধ্যে অনাদায়ী খাতে আটকে আছে ২১১ কোটি টাকা। সরকারি সিকিউরিটিজে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের ঘাটতি ২০৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। আর আইডিআরএ নির্ধারিত ‘অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগের’ সীমা ছাড়িয়েছে ১৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের মধ্যে পিএফআই সিকিউরিটিজে ১৬৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা রয়েছে। এ ছাড়া অনাদায়ী মুনাফা, লভ্যাংশ ও ভাড়া বাবদ রয়েছে ৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। পিএফআই সিকিউরিটিজে আরও ১০ কোটি ৫২ লাখ টাকা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছে পাওনা ১৮৮ কোটি ১১ লাখ টাকা, যা ২০১৮ সাল থেকে অনাদায়ী।

সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে বড় ঘাটতি

প্রাইম ইসলামী লাইফের সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ রয়েছে মাত্র ২৭ কোটি টাকা। অথচ বীমা বিধিমালা অনুযায়ী, কোম্পানির সম্পদের অন্তত ৩০ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

কোম্পানিটির সম্পদের পরিমাণ ছিল ৭৮২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। সে হিসাবে সরকারি সিকিউরিটিজে ন্যূনতম ২৩৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বিনিয়োগের কথা। ফলে এ খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, জিরো কুপন বন্ড, পিএফআইর স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ, স্টার্লিং গ্রুপের বিনিয়োগসহ ‘অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগ’ রয়েছে ১৮৭ কোটি ৮০ লাখ ৪৪ হাজার ৯০৭ টাকা। আইডিআরএর বিধিমালা অনুযায়ী, এ খাতে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও কোম্পানিটির বিনিয়োগ নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বেশি।

বন্ডের অর্থ আদায় অনিশ্চিত

নিরীক্ষকেরা আরও জানিয়েছেন, বাংলালায়নের ১০ শতাংশ কনভার্টিবল জিরো কুপন বন্ডে প্রায় ৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে। এর বিপরীতে জমা মুনাফা রয়েছে ৩ কোটি ৬ লাখ টাকা। বন্ডটির মেয়াদ ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হলেও অর্থ আদায় এখনো অনিশ্চিত।

এ ছাড়া স্টার্লিং গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে কোম্পানিটির ১৫ কোটি টাকার স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগও ২০১৮ সাল থেকে অনাদায়ী। অর্থ আদায়ের জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চারটি দেওয়ানি আবেদন চলমান।

অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়নও হয়নি

কোম্পানিটি জীবন বীমা দায়ের অ্যাকচুয়ারিয়াল তদন্ত ও মূল্যায়ন করেনি বলেও জানিয়েছেন নিরীক্ষকেরা। অথচ ২০১৮ সালের ২৯ মে জারি করা এসআরও ১৬১-আইন/২০১৮-এর ৩০(১) ধারায় এ মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক।

এ ছাড়া সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্য ১৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা লভ্যাংশও ২০১৮ সাল থেকে অনাদায়ী। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে কোম্পানিটির আনরিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

মালিকানা কাঠামোও বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়

নিরীক্ষকেরা জানিয়েছেন, কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে স্পন্সর ও পরিচালকদের মালিকানা ৩৬ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ৬৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। এই মালিকানা কাঠামো আইডিআরএর নির্ধারিত অনুপাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এসব বিষয়ে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সচিব আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম গণমাধ‌্যমে বলেন, পাওনা টাকা আদায়ে মামলা চলমান। আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।