আমেরিকার শুল্ক নীতির ধাক্কা: শেয়ারবাজারে ধস, ব্যবসায়ীদের সামনে অন্ধকার

প্রকাশিত: ৪:২৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৪, ২০২৫

অর্থ নিউজ :

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতি কার্যকর হওয়ার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বিরাট ঝড় উঠেছে। এই নীতির আওতায় প্রায় সব আমদানি পণ্যের ওপর ১০% শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, আর চীন, কানাডা ও মেক্সিকোসহ কিছু দেশের ক্ষেত্রে এই হার ২৫% থেকে ৩৫% পর্যন্ত পৌঁছেছে। ট্রাম্পের দাবি, এই শুল্ক আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি কমাবে এবং দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করবে। তবে, এর ফলে আমেরিকার শেয়ারবাজারে মারাত্মক ধস নেমেছে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তৈরি হয়েছে।

শেয়ারবাজারে ধস: কী ঘটছে?

শুল্ক নীতি ঘোষণার পর থেকেই আমেরিকার প্রধান শেয়ার সূচক—ডাও জোন্স, এস অ্যান্ড পি ৫০০ ও নাসডাক—বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে। ৩ এপ্রিল ২০২৫-এর সকালে বাজার খোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডাও জোন্স ১,৪০০ পয়েন্টের বেশি কমে যায়, নাসডাক ৯০০ পয়েন্ট হারায়, এবং এস অ্যান্ড পি ৫০০-এর পতন ২% ছাড়িয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পর আমেরিকার শেয়ারবাজারের সবচেয়ে খারাপ একক দিনের পতন। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, কারণ এই শুল্ক নীতি বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

ব্যবসায়ীদের ক্ষতি: খরচ বৃদ্ধি ও লাভের সংকট

নতুন শুল্কের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়েছে আমদানি-নির্ভর ব্যবসায়ীদের ওপর। যেসব কোম্পানি বিদেশ থেকে কাঁচামাল বা তৈরি পণ্য আমদানি করে—যেমন অ্যাপল, নাইকি ও জেনারেল মোটরস—তাদের উৎপাদন খরচ এখন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, চীন থেকে আমদানি করা ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশে ১০% বাড়তি শুল্কের ফলে অ্যাপলের আইফোন উৎপাদন খরচ বাড়বে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই অতিরিক্ত খরচ কি তারা গ্রাহকদের ওপর চাপাবে? যদি দাম বাড়ানো হয়, তবে বিক্রি কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। আর যদি কোম্পানিগুলো নিজেরাই এই খরচ বহন করে, তাহলে তাদের লাভের পরিমাণ কমে যাবে।

সাপ্লাই চেইনের বিপর্যয়

আমেরিকার বড় কোম্পানিগুলোর সাপ্লাই চেইন বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত। নতুন শুল্কের ফলে এই চেইন ব্যাহত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি গাড়ির ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ মেক্সিকো থেকে আমদানি করা হয়, তবে ২৫% শুল্কের কারণে সেই যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাবে, যা গাড়ির মোট খরচ বাড়িয়ে দেবে। ফলে, কোম্পানিগুলো হয় উৎপাদন কমাবে, নয়তো অন্য দেশে উৎপাদন সরিয়ে নেবে। কিন্তু এই পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

ছোট ব্যবসায়ীদের দুর্দশা

বড় কোম্পানিগুলো হয়তো কোনোভাবে এই ধাক্কা সামলাতে পারবে, কিন্তু ছোট ব্যবসায়ীরা পড়েছেন মারাত্মক সংকটে। যারা চীন বা ইউরোপ থেকে সস্তা পণ্য এনে খুচরা বাজারে বিক্রি করেন, তাদের জন্য এই শুল্ক একটি দুঃস্বপ্ন। বাড়তি খরচ গ্রাহকদের ওপর চাপালে চাহিদা কমবে, আর না চাপালে লাভের মার্জিন শূন্যের কাছাকাছি চলে আসবে। ফলে, অনেক ছোট ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

শেয়ারবাজারে এত প্রভাব কেন?

শুল্ক ঘোষণার পর থেকে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। প্রযুক্তি খাতের বড় কোম্পানি, যেমন এনভিডিয়া বা টেসলার শেয়ারের মূল্য ৮-১০% কমে গেছে। অটোমোবাইল শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ আমদানি যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের লাভ কমছে। বাজারের এই পতন বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করে দিচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন বিনিয়োগ সংগ্রহকে আরও কঠিন করে তুলছে।

চাকরির বাজারে ঝুঁকি

ট্রাম্প বলছেন, এই শুল্ক নীতি দেশীয় চাকরির সংখ্যা বাড়াবে। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টো চিত্র দেখা যেতে পারে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া ও লাভ কমার কারণে অনেক কোম্পানি কর্মী ছাঁটাই করতে পারে। ইতোমধ্যে কিছু খুচরা ব্যবসায়ী জানিয়েছে, তারা কর্মী সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা করছে। এর ফলে বেকারত্ব বাড়তে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে আরও চাপ সৃষ্টি করবে।

নতুন শুল্ক নীতি আমেরিকার শেয়ারবাজার ও ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। শেয়ারবাজারে ধস ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতি এখনই দৃশ্যমান, তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে। যদি ট্রাম্পের এই নীতি আমেরিকার শিল্পকে সত্যিই শক্তিশালী করতে পারে, তাহলে হয়তো এই ক্ষতি সাময়িক। তবে, যদি এটি ব্যর্থ হয়, তাহলে ব্যবসায়ীদের এই ধাক্কা সামলাতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।