নো-ফ্রিলস হিসাবে আমানত বাড়লেও কৃষকের কমেছে ১০.৩৫ শতাংশ

প্রকাশিত: ৮:৪৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৪, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রান্তিক ও স্বল্প আয়ের মানুষের ব্যাংক হিসাবে আমানত বাড়লেও কৃষকদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। চলতি বছরের মার্চের তুলনায় জুন শেষে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা দিয়ে খোলা নো-ফ্রিলস হিসাবে স্বল্প আয়ের মানুষের মোট আমানত বেড়েছে ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। একই সময়ে কৃষকদের এসব হিসাবে আমানত কমেছে ১০ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এপ্রিল–জুন প্রান্তিকের নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্টসংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে নো-ফ্রিলস হিসাবে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। মার্চ শেষে যা ছিল ৫ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে এসব হিসাবে আমানত বেড়েছে ৮৩ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

একই সময়ে হিসাবের সংখ্যাও বেড়েছে। জুন শেষে ব্যাংকগুলোতে নো-ফ্রিলস হিসাব ছিল ২ কোটি ৯৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৭টি। মার্চ শেষে এ সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৯৩ লাখ ১৬ হাজার ৮৮৯টি। তিন মাসে হিসাব বেড়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার ৮টি বা শূন্য দশমিক ৭৯ শতাংশ।

কৃষকদের আমানতে বড় পতন

সামগ্রিকভাবে নো-ফ্রিলস হিসাবে আমানত বাড়লেও কৃষকদের ক্ষেত্রে তা কমেছে। মার্চ শেষে কৃষকদের এসব হিসাবে আমানত ছিল ৮৬৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। জুন শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৭৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

অর্থাৎ তিন মাসে কৃষকদের আমানত কমেছে ৮৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বা ১০ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

অর্থনীতি গবেষক এম হেলাল আহমেদ খান বলেন, কৃষকদের আমানত কমার অন্যতম কারণ হতে পারে তাঁদের হাতে নগদ অর্থের চাপ বেড়ে যাওয়া। সার, বীজ, সেচ, শ্রম, জ্বালানি ও পরিবহনসহ কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের আয় থেকে উদ্বৃত্ত অর্থ কমছে।

তাঁর মতে, উৎপাদন খরচ মেটাতে অনেক কৃষক ব্যাংক, এনজিও, সমবায় কিংবা অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ নিচ্ছেন। ফলে আয় হওয়ার পর সেই অর্থ সঞ্চয়ে না গিয়ে ঋণ পরিশোধ ও উৎপাদন ব্যয়ে চলে যাচ্ছে। এর সঙ্গে ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। এতে কৃষকের সঞ্চয় করার সক্ষমতা কমে যেতে পারে।

এক বছরেও বেড়েছে আমানত

এক বছরের ব্যবধানেও নো-ফ্রিলস হিসাবে আমানত বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুন শেষে এসব হিসাবে আমানত ছিল ৫ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে আমানত বেড়েছে ৪৫৪ কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ২ শতাংশ।

হিসাবের সংখ্যাও এক বছরে বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুন শেষে নো-ফ্রিলস হিসাব ছিল ২ কোটি ৮৭ লাখ ৬ হাজার ৭৯৯টি। চলতি বছরের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৭টিতে। অর্থাৎ এক বছরে হিসাব বেড়েছে ৮ লাখ ৪১ হাজার ৯৮টি বা ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

নো-ফ্রিলস হিসাব কেন

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে ২০১০ সালে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়া হয়। এসব হিসাব নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট নামে পরিচিত। কৃষক, পোশাকশ্রমিক, অতি দরিদ্র, মুক্তিযোদ্ধা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগীসহ স্বল্প আয়ের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এসব হিসাব ব্যবহার করেন।

এসব হিসাবের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনা। ন্যূনতম ব্যালান্স রাখার বাধ্যবাধকতা না থাকা এবং কম খরচে ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে এসব হিসাবের ব্যবহার বাড়ছে।

প্রবাসী আয়ও কমেছে

নো-ফ্রিলস হিসাবের মাধ্যমে আসা প্রবাসী আয়েও কিছুটা কমেছে। জুন শেষে এসব হিসাবের মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছে ৮৩৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা। মার্চ শেষে যা ছিল ৮৪৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে প্রবাসী আয় কমেছে ৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বা ১ দশমিক ১৫ শতাংশ।

এদিকে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের হিসাবেও আমানতের পরিবর্তন হয়েছে। মার্চ শেষে অতি দরিদ্রদের হিসাবে আমানত ছিল ২৭৭ কোটি টাকা, জুনে তা বেড়ে হয়েছে ২৯২ কোটি টাকা। মুক্তিযোদ্ধাদের হিসাবে আমানত ৯৯০ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১৬ কোটি টাকা। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের হিসাবে আমানত ১ হাজার ৯০২ কোটি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১০৪ কোটি টাকা।

পোশাকশ্রমিকদের হিসাবে মার্চ শেষে আমানত ছিল ৫০৬ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৫১৮ কোটি টাকা।

স্বল্প আয়ের মানুষের ব্যাংক হিসাব ও সামগ্রিক আমানত বৃদ্ধির মধ্যে কৃষকদের আমানত কমে যাওয়ার এই প্রবণতা তাঁদের আয়, উৎপাদন ব্যয় ও সঞ্চয় সক্ষমতার ওপর চাপের বিষয়টি সামনে এনেছে।