সুপ্রিম কোর্টে বাজেট বরাদ্দ-বিচারক নিয়োগ চেয়ে লিগ্যাল নোটিশ

প্রকাশিত: ৩:৪৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিনিধি : সুপ্রিম কোর্টসহ বিচার বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত ও যুক্তিসঙ্গত বাজেট বরাদ্দ, জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার, ন্যায্য ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী।

জনস্বার্থে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব এবং ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার রেজিস্টার্ড ডাকযোগে ও ই-মেইলে এই নোটিশ পাঠান।

লিগ্যাল নোটিশে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং অ্যাটর্নি জেনারেলকে বিবাদী করা হয়েছে।

নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিক ও আইনজীবী হিসেবে সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব তাদের রয়েছে এবং আদালতের কর্মকর্তা হিসেবে তারা সংবিধান লঙ্ঘন রোধেও শপথবদ্ধ। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক রাখার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা ছাড়া তা কার্যকর হওয়া সম্ভব নয়।

আইনজীবীরা নোটিশে উল্লেখ করেন, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সুপ্রিম কোর্টের জন্য মাত্র ২৯১ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ২৭০ কোটি টাকা। অথচ দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের তুলনায় এই বরাদ্দ অত্যন্ত নগণ্য।

নোটিশে মাননীয় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের একটি সাম্প্রতিক বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, যেখানে তিনি সমগ্র বিচার বিভাগকে সবচেয়ে অবহেলিত খাত হিসেবে আখ্যায়িত করে জানান, সমগ্র বিচার বিভাগের জন্য মোট বরাদ্দ মাত্র ২২০০ কোটি টাকা। যেখানে শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জন্যই বরাদ্দ ২৫০০ কোটি টাকা এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪,০০০ কোটিরও বেশি। অর্থাৎ, ১৭ কোটিরও বেশি নাগরিকের ন্যায়বিচারের দায়িত্বে থাকা সমগ্র বিচার বিভাগের বরাদ্দ একটি মাত্র সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের চেয়েও কম, যা আইনমন্ত্রীর নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ীই রাষ্ট্রের অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে।

নোটিশে বলা হয়েছে, ২২০০ কোটি টাকার বড় অংশই ব্যয় হবে আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে অধস্তন আদালতের বেতন-ভাতা, প্রশাসন, অবকাঠামো এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ভবন নির্মাণ, ই-জুডিশিয়ারি স্বয়ংক্রিয়করণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে। তা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দকৃত সম্পদের ব্যাপ্তি, মামলাজট ও সাংবিধানিক গুরুত্বের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিচার বিভাগের প্রতি এই অবহেলা নতুন কোনো ঘটনা নয় উল্লেখ করে নোটিশে বলা হয়, গত দুই দশক ধরে জাতীয় বাজেটের গড়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৪১ শতাংশ বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে এবং কোনো কোনো বছর সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ শূন্যও ছিল। অথচ, উচ্চ ও অধস্তন আদালত মিলিয়ে প্রায় ৩৭ লাখ মামলা বিচারাধীন।

নোটিশে বলা হয়, বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের বোঝা নয় বরং কোর্ট ফি, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক, প্রসেস ফি ও জরিমানার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় হয়ে থাকে। তবে, নোটিশে এও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিচার বিভাগের প্রকৃত মোট রাজস্ব আয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট ও পৃথক সরকারি হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায় না, যা নিজেই রাষ্ট্রের অমনোযোগিতার একটি প্রমাণ। এ বিষয়ে একটি পৃথক ও স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশেরও দাবি জানানো হয়েছে নোটিশে।

পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে আইনজীবীদের জন্য পর্যাপ্ত চেম্বার, বসার ব্যবস্থা, শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি, ডিজিটাল ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং লাইব্রেরি সুবিধার তীব্র ঘাটতি রয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষও একই কারণে ভিড়, বিলম্ব ও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাবে ভুগছেন বলে জানানো হয়।

অপর্যাপ্ত বরাদ্দের সরাসরি ফলাফল হিসেবে দীর্ঘস্থায়ী মামলাজট, বিচারক-মামলার অসামঞ্জস্যপূর্ণ অনুপাত, আধুনিক মামলা ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর অভাব এবং মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব সৃষ্টি হচ্ছে বলে নোটিশে বলা হয়, যা বিচারপ্রার্থীদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করছে।

সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে নোটিশে জানানো হয়, দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালত মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ ১০ হাজারেরও বেশি মামলা বিচারাধীন, যা কেবল বিচারিক নয়, একটি সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে জনগণের আস্থা কমছে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে।