মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ১২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

প্রকাশিত: ৯:২০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসিতে সংঘবদ্ধভাবে নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। এ-সংক্রান্ত একটি অভিযোগ সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা পড়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর পাঠানো অভিযোগের নথিতে বলা হয়েছে, ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) তাপস চন্দ্র পাল ব্যাংকের সাসপেন্স হিসাব ও ব্যয় হিসাব ব্যবহার করে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ঘটনায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মতিউল হাসান, কয়েকজন পরিচালক এবং আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে ব্যাংকের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর), ল্যাপটপ ও সফটওয়্যার, আসবাবপত্র কেনাকাটা এবং বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

নথির তথ্য অনুযায়ী, তাপস চন্দ্র পাল দীর্ঘদিন ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভিশন (এফডিএ) ও সিএফও কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তিনি ব্যাংকের আর্থিক হিসাব ও বিভিন্ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার এবং কারসাজি করেছেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কয়েকজন পরিচালক ও এমডি মতিউল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই অর্থ কীভাবে, কোন কোন হিসাবে এবং কার স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয় ব্যাংকের অর্থে

অভিযোগে বলা হয়েছে, তাপস চন্দ্র পালের স্ত্রী দীর্ঘদিন সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নেন। সেখানে চিকিৎসায় ব্যয় করা অর্থের একটি অংশ ব্যাংকের সাসপেন্স হিসাব থেকে পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে আনার খরচও ব্যাংকের অর্থে বহন করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া তার স্ত্রীর চিকিৎসাকালীন ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা সিঙ্গাপুরে যান। তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যয়ও ব্যাংকের অর্থ থেকে পরিশোধ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, ব্যক্তিগত চিকিৎসা বা এ-সংক্রান্ত ব্যয় ব্যাংকের অনুমোদিত খাতের বাইরে হলে তা আর্থিক শৃঙ্খলার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কেনাকাটা ও সিএসআর ব্যয়েও অনিয়মের অভিযোগ

ব্যাংকের ল্যাপটপ ও সফটওয়্যার কেনাকাটা, আসবাবপত্র সংগ্রহ এবং সিএসআর ব্যয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে দরপত্র, অনুমোদন, প্রকৃত মূল্য এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

একইভাবে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির অর্থ ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অর্থ কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি পাওনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিষয়গুলো গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

দ্রুত পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন

জানা গেছে, তাপস চন্দ্র পাল রূপালী ব্যাংকে কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে জুনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতি পান তিনি।

তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি), ২০২১ সালে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসভিপি), ২০২২ সালে এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (ইভিপি) এবং ২০২৪ সালে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি) পদে উন্নীত হন তাপস চন্দ্র পাল। সর্বশেষ ২০২৬ সালে তিনি ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান।

তার এই দ্রুত পদোন্নতির পেছনে কয়েকজন পরিচালকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং তাদের বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সিএ, এসিসিএ বা এফসিএর মতো পেশাগত সনদ না থাকার পরও তাপস চন্দ্র পাল ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। দীর্ঘদিন এফডিএ ও সিএফও কার্যালয়ে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি আর্থিক বিবরণীতে কারসাজি করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘ব্যাংক থেকে কোনো টাকা নেওয়ার সুযোগ নাই’

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ডিএমডি ও সিএফও তাপস চন্দ্র পাল অনলাইন সংবাদ মাধ‌্যম সারাবাংলাকে বলেন, ‘এটা নিয়ে আমার বলার কিছু নাই। জ্ঞানত এ ধরনের কোনো প্রশ্ন এখন পর্যন্ত আমার কাছে আসেনি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দিস ইজ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এক টাকা নেওয়ার আপনার-আমার, কারও ক্ষমতা নাই। ব্যাংক থেকে কোনো টাকা নেওয়ার সুযোগ নাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘উইদাউট অ্যানি ডকুমেন্টস, উইদাউট অ্যানি প্রোপার অ্যাপ্রুভাল একপয়সাও এদিক থেকে ওদিকে যাওয়ার কোনো ক্ষমতা নাই।’

অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাপস চন্দ্র পাল বলেন, ‘আপনার বিবেককে বলেন না। নিজেকে প্রশ্ন করুন—ইজ ইট পসিবল? ব্যাংকের টাকা ইচ্ছামতো নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ আছে?’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাংকের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও অনুমোদন রয়েছে। এটা আমি আপনাকে বললাম। এখন বাকিটা আপনাদের হাতে। যেহেতু আপনারা জ্ঞানী মানুষ, আপনারা বিবেচনা করুন।’

পদোন্নতির বিষয়ে কিছু কাগজপত্র দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘সিএফও হওয়ার সকল যোগ্যতা আমার আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কী পেয়েছে না পেয়েছে, আমার জানা নেই।’

‘সত্যতা পেলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা’

মার্কেন্টাইল ব্যাংক ইস্যুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সিএফও তাপস চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, এর জবাব আমরা ব্যাংক ও তার কাছে চাইব। যদি অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাই, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় মার্কেন্টাইল ব্যাংকের আর্থিক সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কিছু নিয়ন্ত্রক পরিদর্শকের নীরব সহযোগিতায় অনিয়মগুলো দীর্ঘদিন চলেছে। এসব বিষয়েও অধিকতর তদন্ত চলছে।