সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সে ধ্বংসস্তূপের ভার:গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা পাওনা, সম্পদ বিক্রিতেও মিলছে না সমাধান—দায় কার, প্রশ্ন হাজারো গ্রাহকের

প্রকাশিত: ১:১০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৯, ২০২৬

শেখ মনিরুল ইসলাম, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টারঃ সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড—একসময় সম্ভাবনাময় একটি বীমা প্রতিষ্ঠান। আজ সেই প্রতিষ্ঠানই যেন আর্থিক সংকট, গ্রাহকের পাওনা, ব্যবস্থাপনার চাপ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তাগাদার এক জটিল গোলকধাঁধায় আটকে আছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার গ্রাহক বছরের পর বছর ধরে তাদের বীমার টাকা পাওয়ার অপেক্ষায়। কেউ চেক হাতে পেয়েও অর্থ তুলতে পারছেন না, কেউ নতুন চেকের আশায় দিনের পর দিন ঘুরছেন, আবার কেউ অফিসে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন।

রাজধানীর গুলশান-১-এর রাফি টাওয়ারে ৯ম ১০ম তলায় প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে এমনই এক হতাশাজনক চিত্রের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের ভাষ্য, পাওনা অর্থের জন্য বারবার যোগাযোগ করেও তারা নিশ্চিত কোনো সমাধান পাচ্ছেন না। অনেকের অভিযোগ, অফিসে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও পরিচ্ছন্ন একজন বিমাবিদ বাবু পিপলু বিশ্বাসও পরিস্থিতিকে অত্যন্ত কঠিন বলে বর্ণনা করেছেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপকালে তার বক্তব্যের সারমর্ম—একদিকে গ্রাহকের চাপ, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চাপ; পাশাপাশি মালিকপক্ষের নানা চাপ—সব মিলিয়ে তিনি নিজেও অনেকটা অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন।

একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে এমন অবস্থায় পৌঁছাল?

অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০০ সালের দিকে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার পর একটি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি তুলনামূলকভাবে ভালোভাবেই পরিচালিত হচ্ছিল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তৎকালীন সময়ে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও রুবিনা হামিদের নাম নেতৃত্বের পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ছিল বলে জানা যায়।

তবে পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বের পরিবর্তন, ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং আর্থিক অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির ভিতকে দুর্বল করে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের অভিযোগ, অতীতে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে ভুয়া ভাউচার, ভুয়া বিল, রিনিউয়াল ব্যবসাকে প্রথমবর্ষের ব্যবসা হিসেবে দেখানো এবং প্রকৃত ব্যবসার তুলনায় অতিরিক্ত ব্যবসা প্রদর্শনের মতো অনিয়ম ঘটেছে। এমনকি ১০০ কোটি টাকার ব্যবসাকে ২০০ কোটি টাকা হিসেবে দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সময়ের অডিট রিপোর্ট, পরিচালনা পর্ষদের নথি, আইডিআরএর পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং অন্যান্য আর্থিক দলিল স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। কারা এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

মালিকানা পরিবর্তনেও কাটেনি সংকট

পরবর্তীতে গ্রীন ডেল্টা নামে একটি প্রতিষ্ঠান সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স অধিগ্রহণ করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। কিন্তু মালিকানা পরিবর্তনের পরও প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট কাটেনি।

নতুন মালিকপক্ষের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি অধিগ্রহণের পর তারা গুরুতর আর্থিক চাপের মুখে পড়েছেন। একদিকে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ গ্রাহকের দাবি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

আইডিআরএর পক্ষ থেকেও গ্রাহকের দাবি পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ ব্যবহারের নির্দেশনা বা চাপ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সম্পদ বিক্রি করেও যদি সব গ্রাহকের দায় পরিশোধ করা সম্ভব না হয়, তাহলে অবশিষ্ট দায়ের অর্থ আসবে কোথা থেকে?

একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করে কতজনের দায় মেটানো সম্ভব?
বর্তমান ব্যবস্থাপনা সূত্রে জানা গেছে, একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করে পাওয়া অর্থের একটি অংশ গ্রাহকদের মধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু কয়েকজন গ্রাহকের দাবি, এর পরিমাণ ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কোনো কোনো পর্যায়ে একসঙ্গে প্রায় ১১০ কোটি টাকার মতো গ্রাহকের পাওনা জমে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে—একটি সম্পদ বিক্রি করে সাময়িকভাবে কিছু গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ করা গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে এভাবে কি কয়েক লাখ গ্রাহকের দায় মেটানো সম্ভব?

প্রথমবর্ষের ব্যবসা নেই বললেই চলে
প্রতিষ্ঠানটির অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তার ভাষ্য আরও উদ্বেগজনক। তার দাবি, নতুন ব্যবসা বা প্রথমবর্ষের প্রিমিয়াম সংগ্রহ প্রায় নেই বললেই চলে। যতটুকু প্রিমিয়াম আসে, তা দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, অফিস পরিচালনা ও অন্যান্য নিয়মিত ব্যয় মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান মালিকপক্ষ নতুন করে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নয়। ফলে একদিকে নতুন ব্যবসা বাড়ছে না, অন্যদিকে পুরোনো গ্রাহকদের দায় ক্রমেই বাড়ছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন—নতুন বিনিয়োগ ছাড়া, পর্যাপ্ত ব্যবসা ছাড়া এবং সীমিত সম্পদ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে গ্রাহকদের দীর্ঘমেয়াদি দায় পরিশোধ করবে?

গ্রাহক তো কোনো অপরাধ করেননি; সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই
একজন গ্রাহক নিয়ম মেনে ব্যাংকের মাধ্যমে বছরের পর বছর প্রিমিয়াম দিয়েছেন। কোম্পানির প্রতিনিধি এসে তাকে বীমা করতে উৎসাহিত করেছেন।

কোম্পানি তার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে, পলিসি দিয়েছে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে নির্দিষ্ট সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তাহলে প্রতিষ্ঠানের অতীত ব্যবস্থাপনায় যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, কোনো আর্থিক দুর্বলতা তৈরি হয়ে থাকে কিংবা মালিকানা পরিবর্তনের কারণে সংকট দেখা দেয়তার দায় কেন একজন সাধারণ গ্রাহক বহন করবেন?

গ্রাহকদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার—আমরা তো সময়মতো টাকা দিয়েছি, এখন আমাদের টাকা ফেরত পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে কেন?”

অফিসে গ্রাহকের ভিড়, চেক হাতে অপেক্ষার প্রহর
রাজধানীর গুলশান-১-এর রাফি টাওয়ারে সানলাইফের কার্যালয়ে আসা কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, পাওনা টাকার জন্য তাদের বারবার অফিসে আসতে হচ্ছে। কারও হাতে চেক দেওয়া হলেও তা নিয়ে অর্থ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আবার নতুন চেকের জন্যও দীর্ঘ অপেক্ষার অভিযোগ রয়েছে।

কেউ কেউ অফিসে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। এমনকি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে কিছু গ্রাহকের মধ্যে।

তবে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা বলছে, তাদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণেই পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

দোষ কার—আইডিআরএ, সরকার, মালিক নাকি অতীত ব্যবস্থাপনা?
সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি কোম্পানির সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের বীমা খাতের জন্যও একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

যদি অতীতে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি?
যদি কোম্পানির আর্থিক অবস্থার অবনতি দীর্ঘদিন ধরেই হয়ে থাকে, তাহলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সময়মতো কী ব্যবস্থা নিয়েছে?
মালিকানা পরিবর্তনের পর নতুন মালিকপক্ষ যদি পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করে থাকে, তাহলে তাদের দায়িত্ব কী?
বর্তমান ব্যবস্থাপনা যদি পুরোনো দায়ের বোঝা নিয়ে কাজ করে থাকে, তাহলে তাদের জন্য কী ধরনের বাস্তবসম্মত পুনর্গঠন পরিকল্পনা রয়েছে?
আর সবকিছুর মাঝখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়?

সরকারের সামনে এখন জরুরি তিনটি কাজ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু কোম্পানির ওপর ছেড়ে দিলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইডিআরএর উচিত দ্রুত একটি স্বচ্ছ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা।

প্রথমত, সানলাইফের বর্তমান সম্পদ, দায়, গ্রাহকের মোট পাওনা, বিনিয়োগ, ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, অতীতে যদি ভুয়া ভাউচার, ভুয়া বিল, ব্যবসার হিসাব ফুলিয়ে দেখানো কিংবা অন্য কোনো আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তৃতীয়ত, গ্রাহকদের টাকা ফেরতের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে। কোন শ্রেণির গ্রাহক আগে টাকা পাবেন, কী পরিমাণ অর্থ দেওয়া হবে এবং অর্থের উৎস কী—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।

কয়েক লাখ ক্ষুদ্র গ্রাহকের ভবিষ্যৎ কী?
বীমা মূলত মানুষের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার একটি আর্থিক ব্যবস্থা। একজন ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী মাসে মাসে বা বছরে বছরে সামান্য অর্থ জমিয়ে ভবিষ্যতে একটি নির্দিষ্ট আর্থিক সুবিধার আশায় পলিসি করেন।

সেই মানুষটির কাছে হয়তো ১ লাখ টাকা, ২ লাখ টাকা কিংবা ৫ লাখ টাকা বিশাল অঙ্কের অর্থ। অথচ কোম্পানির আর্থিক সংকটের কারণে সেই টাকা যদি বছরের পর বছর আটকে থাকে, তাহলে তার পরিবার, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা অবসরকালীন পরিকল্পনা সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ইতোমধ্যে জাতীয় প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন জায়গায় গ্রাহক ও কর্মীদের সভা, সংবাদ সম্মেলন এবং বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। মূল দাবি একটাই গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত কি গ্রাহকের টাকা ফেরত আসবে?
সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা পুনরুদ্ধার। শুধু নতুন চেক দেওয়া কিংবা সাময়িকভাবে কিছু অর্থ পরিশোধ করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না।

প্রয়োজন—সম্পূর্ণ হিসাব প্রকাশ, দায় নির্ধারণ, অতীত অনিয়মের তদন্ত, মালিকপক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণ, ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা।

আর যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে অতীতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দায়িত্বে থেকে প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক ক্ষতি করেছে, তাহলে তাদের দায় নির্ধারণ না করে শুধু বর্তমান ব্যবস্থাপনা কিংবা সাধারণ গ্রাহকদের ওপর সেই বোঝা চাপানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সানলাইফের সংকট তাই শুধু একটি বীমা কোম্পানির আর্থিক সংকট নয়; এটি গ্রাহকের আস্থা, বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের বীমার প্রতি বিশ্বাস—তিনটিরই পরীক্ষা।

হাজার হাজার গ্রাহক এখন একটাই প্রশ্নের উত্তর চান—”আমরা নিয়ম মেনে টাকা দিয়েছি; আমাদের টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়?”