এনবিএফআইয়ের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা

প্রকাশিত: ৩:৩৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬

ফারজানা ফারাবী : দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) খেলাপি ঋণ গত চার বছরে বেড়েছে ৫ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিক শেষে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৪৩২ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ২০২২ সালের মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ১৪ হাজার ২৩২ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে এনবিএফআইগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ১১৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশই খেলাপি বা ওভারডিউ ঋণ। একই সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার ৩৫৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে এনবিএফআই খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ১৩ হাজার ১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে এ খাতে ঋণের মানের অবনতি হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনিয়ম, জালিয়াতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে এনবিএফআই খাতে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলছে। এতে একদিকে খেলাপি ঋণ বাড়ছে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়, মূলধন ও তারল্যের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

আমানত ফেরত দিতে পারছে না কিছু প্রতিষ্ঠান

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অন্তত ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের অর্থ সময়মতো ফেরত দিতে পারছে না। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)।

করোনার সময়ে ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় এ খাতে চাপ আরও বাড়ে। পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও আর্থিক দুর্বলতার তথ্য প্রকাশ্যে এলে আমানতকারীদের একটি অংশ টাকা তুলে নিতে শুরু করেন। এতে কিছু প্রতিষ্ঠানের তারল্য সংকট আরও প্রকট হয়।

এসব প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের ঘটনায় সাবেক ব্যবসায়ী প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের নামও আলোচনায় আসে। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও তদন্ত হয়েছে। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠা একাধিক প্রতিষ্ঠানও পরে আর্থিক সংকটে পড়ে।

প্রভিশনেও বাড়ছে চাপ

খেলাপি ঋণ বাড়ায় এনবিএফআইগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজনও বাড়ছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমার পাশাপাশি মূলধন ও তারল্যের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। আমানতকারীরা অর্থ ফেরত নিতে চাইলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমে এবং কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।

ব্যাংকখাত বিশ্লেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত কিছু সুবিধার কারণে খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে সাময়িক স্বস্তি দেখা গেলেও ব্যাংকখাতের মৌলিক দুর্বলতা কাটেনি। কঠোর তদারকি, সুশাসন ও ঋণশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আবারও খেলাপি ঋণ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তিনি বলেন, ঋণ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আব্দুল বায়েস বলেন, বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা চাপে আছেন। ফলে ঋণ পরিশোধেও সমস্যা হচ্ছে। খেলাপি ঋণ কমাতে সামগ্রিক ব্যবসা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তবে নিয়মিত ঋণগ্রহীতাদের নিরুৎসাহিত করে এমন সুবিধা খেলাপিদের দেওয়া ঠিক নয়।

তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতে ধারাবাহিকতা থাকা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিল ও প্রভিশন ঘাটতি কমিয়ে আনতে হবে।