বীমা খাতে আইডিআরএর মূলধন তলবে বিভ্রান্তি

প্রকাশিত: ৩:৪১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের লাইফ ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর পরিশোধিত মূলধনের তথ্য চেয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) জারি করা পৃথক দুটি চিঠি নিয়ে বীমা খাতে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। চিঠিতে কোম্পানিগুলোর পরিশোধিত মূলধন কোন ব্যাংকের কোন শাখায় এবং কী ধরনের হিসাবে রাখা আছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে এসব তথ্যের পক্ষে ব্যাংকের প্রমাণকও চাওয়া হয়েছে।

গত ৬ সেপ্টেম্বর আইডিআরএর লাইফ ও নন-লাইফ অনুবিভাগ থেকে পৃথক দুটি সার্কুলার জারি করা হয়। লাইফ অনুবিভাগের উপপরিচালক মো. ইফতেখারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে তিন কার্যদিবসের মধ্যে এবং নন-লাইফ অনুবিভাগের উপপরিচালক মো. সোলায়মান স্বাক্ষরিত চিঠিতে দুই কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত ছকে তথ্য পাঠাতে বলা হয়।

চিঠির ছকে পরিশোধিত মূলধনের অর্থ দেখানোর জন্য এফডিআর, সঞ্চয়ী হিসাব ও অন্যান্য—এই তিনটি খাত রাখা হয়েছে। নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে এসব তথ্যের পক্ষে যাবতীয় ব্যাংক প্রমাণকও চেয়েছে আইডিআরএ।

তবে আইডিআরএর এই ছক নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ, বীমা আইন অনুযায়ী কোম্পানি গঠনের সময় জমা দেওয়া পরিশোধিত মূলধন এবং পরবর্তী সময়ে ব্যবসার মাধ্যমে মূলধন বৃদ্ধির বিষয়টি এক নয়।

বীমা আইন ২০১০-এর ২১ ধারা অনুযায়ী, বীমা কোম্পানির নিবন্ধন বা অনুমোদনের সময় উদ্যোক্তাদের ১৮ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন কোনো অনুমোদিত ব্যাংকে উদ্যোক্তাদের নিজ নিজ অংশ দায়মুক্তভাবে জমা রাখতে হয়। এ অর্থ এমটিডিআর/এফডিআরের মাধ্যমে রাখতে হয়।

একই সঙ্গে আইনের ২৩ ধারা অনুসারে বাংলাদেশ ব্যাংকে ট্রেজারি বন্ড বা অনুমোদিত সিকিউরিটিজের মাধ্যমে দেড় কোটি টাকার সংবিধিবদ্ধ জামানত বীমা কোম্পানির নামে রাখতে হয়। এ ক্ষেত্রে এই উভয় হিসাবের অর্থ আইডিআরএর অনুকূলে লিয়েন রাখতে হয়।

প্রাথমিক অনুমোদনের এই পর্যায়ে কোনো অবস্থাতেই সঞ্চয়ী বা অন্য কোনো চলতি হিসাবে মূলধনের টাকা অলস রাখার আইনি সুযোগ নেই। অথচ আইডিআরএর চিঠির ছকে পরিশোধিত মূলধন কোন সঞ্চয়ী বা ‘অন্যান্য’ হিসাবে রয়েছে, তারও কলাম রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া বছরের পর বছর ব্যবসা করে অনেক বীমা প্রতিষ্ঠান মুনাফার অংশ বা রিটেইনড আর্নিংস থেকে শেয়ারহোল্ডারদের বোনাস শেয়ার দিয়ে পরিশোধিত মূলধনের আকার বাড়িয়েছে। বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে নতুন কোনো নগদ অর্থ প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে না। বরং ইকুইটির অভ্যন্তরীণ অর্থ মূলধনে রূপান্তর করা হয়। ফলে ওই মূলধনের অর্থ কোন ব্যাংকের হিসাবে বা কোন এফডিআরে রয়েছে, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে না।

আইডিআরএর মুখপাত্র ও মিডিয়া ও যোগাযোগ বিভাগের কর্মকর্তা সাদিক আরমান বলেন, আইডিআরএ নতুন করে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী বীমা খাতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, আইডিআরএ সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠানের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, এটা আইডিআরএর নিয়মিত কার্যক্রমেরই অংশ। পরিশোধিত মূলধন সংক্রান্ত যে তথ্য চাওয়া হয়েছে, তা সাধারণত আইডিআরএকে নিয়মিতই দিতে হয়। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি মূলধনের অর্থ অন্য কোনো খাতে ব্যবহার করে থাকে, সে ক্ষেত্রে তাদের জন্য বিষয়টি কিছুটা জটিলতা তৈরি করতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্য একটি লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠানের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূলধন অনুমোদনের পর বিভিন্ন লাভজনক খাতে এবং দৈনন্দিন পরিচালন কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়। পরিশোধিত মূলধন কখনোই ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবে জমা থাকে না।

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে আইডিআরএর পাঠানো ছকটি আরও স্পষ্টভাবে খাত ভাগ করে, অর্থাৎ যে যে খাতে বিনিয়োগের বিধান আছে, সেভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। তা না হলে বর্তমানে পাঠানো ছকে অনেক কোম্পানির মূলধনের হিসাব দিতে সমস্যা হবে।

আইডিআরএ ও সিএসইর তথ্য অনুসারে, বর্তমানে দেশের সরকারি-বেসরকারি ৩৫টি লাইফ বীমা কোম্পানির অথরাইজড ক্যাপিটাল বা অনুমোদিত মূলধনের পরিমাণ ৪ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। আর পেইড-আপ ক্যাপিটাল বা পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১ হাজার ২৫১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এই হিসাবের মধ্যে বিদেশি মালিকানাধীন মেটলাইফ অন্তর্ভুক্ত নয়।

সূত্র: বাণিজ‌্য প্রতিদিন