ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যানসহ ৫ পরিচালকের পদ শূন্য? আইনের ১০৮ ধারা, তদন্তের অসঙ্গতি ও সুশাসন সংকটে নতুন প্রশ্ন প্রকাশিত: ৪:৪১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৪, ২০২৬ অনুসন্ধানী প্রতিবেদকঃ ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ সাঈদ খোকনসহ পাঁচজন পরিচালকের পরিচালক পদ আইনগতভাবে শূন্য হয়ে গেছে কি না—এ প্রশ্ন এখন বীমা খাতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কোম্পানি আইন, আইডিআরএ’র তদন্ত, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক অ্যান্ড কোং-এর প্রতিবেদন এবং কোম্পানির পর্ষদ সভার কার্যবিবরণী ও হাজিরা শিট পর্যালোচনা করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ সাঈদ খোকন পরপর তিনটি বোর্ড সভায় পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া অনুপস্থিত ছিলেন। একইভাবে চেয়ারম্যানের তিন মেয়ে—পরিচালক আয়েশা নিভ্রাস সাঈদ, ফাতিমা নওশিন মায়শা সাঈদ অরোরা ও রিফা নানজিবা সাঈদ এবং ভাইস চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদের স্ত্রী পরিচালক মাহমুদা নাসিমও পরপর একাধিক বোর্ড সভায় অনুপস্থিত ছিলেন বলে কার্যবিবরণী ও হাজিরা শিট বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ১০৮ ধারা এবং কোম্পানির আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনের (এওএ) ৯০(৬) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া কোনো পরিচালক পরপর তিনটি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত থাকলে তার পদ শূন্য হয়ে যায়। যে তিনটি সভা নিয়ে বিতর্ক বিতর্কিত তিনটি সভা হলো কোম্পানির ২৪৬তম, ২৪৭তম ও ২৪৮তম পরিচালনা পর্ষদ সভা। সভাগুলো ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই তিনটি সভায় চেয়ারম্যান সাঈদ খোকন উপস্থিত ছিলেন না। একই সঙ্গে তার তিন মেয়ে এবং পরিচালক মাহমুদা নাসিমের উপস্থিতির বিষয়েও গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে। আইডিআরএ’র তদন্তে চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতি, কিন্তু অনুমোদনের তথ্য নেই বোর্ড সভা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে আইডিআরএ। উপ-পরিচালক মো. সোলায়মানের নেতৃত্বাধীন কমিটি ১৭ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চেয়ারম্যান ব্যক্তিগত কারণে তিনটি সভায় উপস্থিত হতে পারেননি। ২৪৬তম সভায় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকায় সভাপতিত্ব করেন আলহাজ মো. ইসমাইল নবাব। পরবর্তী দুই সভায় সভাপতিত্ব করেন ভাইস চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ। তবে চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতির জন্য পরিচালনা পর্ষদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছিল কি না—সে বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। মাহফেল হকের তদন্তে ভিন্ন চিত্র পরবর্তীতে আইডিআরএ নিয়োগকৃত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক অ্যান্ড কোং চলতি বছরের ১৫ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়, চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ সাঈদ খোকন পরপর তিনটি বোর্ড সভায় অনুমোদন ছাড়া অনুপস্থিত ছিলেন এবং তার কোনো ছুটিও অনুমোদিত হয়নি। ফলে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ১০৮(১)(চ) ধারা এবং কোম্পানির এওএ অনুযায়ী তার পরিচালক পদ শূন্য হওয়ার বিষয়টি বিবেচনার জন্য কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। চার পরিচালকের অনুপস্থিতি তদন্তেই এলো না প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, চেয়ারম্যানের তিন মেয়ে—আয়েশা নিভ্রাস সাঈদ, ফাতিমা নওশিন মায়শা সাঈদ অরোরা এবং রিফা নানজিবা সাঈদ—কেউই ২৪৬, ২৪৭ ও ২৪৮তম সভায় উপস্থিত ছিলেন না। এছাড়া পরিচালক মাহমুদা নাসিমও পরপর চারটি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত ছিলেন বলে কার্যবিবরণী, হাজিরা শিট ও স্বাক্ষর পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়। তবে বিস্ময়করভাবে এই চার পরিচালকের অনুপস্থিতির বিষয়টি আইডিআরএ’র তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা মাহফেল হক অ্যান্ড কোং-এর তদন্ত প্রতিবেদনে স্থান পায়নি। হাজিরা শিটে স্ত্রীর স্থলে স্বামীর স্বাক্ষর অনুসন্ধানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে যে, ২৪৬ ও ২৪৭তম সভার কার্যবিবরণীতে মাহমুদা নাসিমকে উপস্থিত দেখানো হলেও হাজিরা শিটে তার স্থানে স্বাক্ষর করেন তার স্বামী ও কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ। অন্যদিকে ২৪৮তম সভার হাজিরা শিটে মাহমুদা নাসিমের নামে যে স্বাক্ষর রয়েছে, তা তার অন্যান্য সভার স্বাক্ষরের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। এসব তথ্য বিশ্লেষণে তার প্রকৃত উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ‘প্রক্সি স্বাক্ষর’ নাকি জালিয়াতি? আইডিআরএ’র তদন্ত প্রতিবেদনে মাহমুদা নাসিমের স্থলে নূর মোহাম্মদের স্বাক্ষরকে ‘প্রক্সি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আইনজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে “প্রক্সি স্বাক্ষর” নামে কোনো স্বীকৃত ধারণা নেই। দণ্ডবিধির ৪৬৮ ধারা অনুযায়ী অন্যের স্বাক্ষর জাল করে ব্যবহার করা বা প্রতারণার উদ্দেশ্যে জাল দলিল তৈরি করা গুরুতর অপরাধ, যার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ কারণে আইডিআরএ’র তদন্তে ঘটনাটিকে ‘প্রক্সি’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রকৃত অপরাধের গুরুত্ব আড়াল করা হয়েছে কি না—সে প্রশ্নও উঠেছে। ৬ উদ্যোক্তা পরিচালকের অভিযোগ ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ছয়জন সাবেক উদ্যোক্তা পরিচালক আইডিআরএ’র কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, ২০১২ সালে চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে আলহাজ মোহাম্মদ সাঈদ খোকন পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ছাড়াই দীর্ঘ ১৩ বছর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং বিভিন্ন অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে আসছেন। অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, ছয়জন উদ্যোক্তা পরিচালককে বাদ দিয়ে নিজের পরিবারের সদস্য ও নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের পরিচালক করা হয়েছে। এ অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করে আইডিআরএ। আর্থিক অনিয়ম তদন্তে হাইকোর্টের নির্দেশ পরিচালকদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য আইডিআরএ’কে আগামী ২৬ অক্টোবরের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। কোম্পানি ম্যাটার নং-৭১৮/২০২৬-এর শুনানি শেষে গত ৯ জুলাই বিচারপতি মো. তৌফিক ইনামের বেঞ্চ এ আদেশ দেন। কোম্পানির অবস্থান ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি চৌধুরী এহসানুল হক স্বাক্ষরিত লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়েছে, বিষয়গুলো বর্তমানে তদন্তাধীন, পুনর্তদন্তাধীন এবং আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন নয়। অন্যদিকে আইডিআরএ’র মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি জানিয়েছেন, পরিচালনা পর্ষদ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সুশাসন ফিরিয়ে আনতে বোর্ড পুনর্গঠনের দাবি জোরালো বীমা খাতের সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, একই পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে যখন কোম্পানি আইন লঙ্ঘন, বোর্ড সভায় অনিয়ম, উপস্থিতি সংক্রান্ত প্রশ্ন, তদন্ত প্রতিবেদনের অসঙ্গতি এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ একসঙ্গে উঠে এসেছে, তখন করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে আইডিআরএ’র দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তাদের অভিমত, কোম্পানি আইন অনুযায়ী যদি অভিযুক্ত পরিচালকদের পদ শূন্য হওয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে বর্তমান বোর্ড বিলুপ্ত করে আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনই হতে পারে সংকট উত্তরণের কার্যকর পথ। এতে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার, পলিসিধারক ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি বীমা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথও সুগম হবে। বীমা খাতের একাধিক বিশেষজ্ঞ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, আইডিআরএ চেয়ারম্যান চলমান তদন্ত, আদালতের নির্দেশনা এবং বিদ্যমান আইনগত বিধান পর্যালোচনা করে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। তাদের মতে, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হলে শুধু ইসলামী ইন্স্যুরেন্স নয়, পুরো বীমা খাতেই জবাবদিহিতা ও সুশাসনের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে। আগামী ২৭ আগস্ট এজিএম সভার প্রস্তুতি চলছে যা নিয়ে নতুন বিতর্ক রয়েছে, অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে, আগামী ২৭ আগস্ট ২০২৬ ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের একটি সভা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোম্পানি আইন, চলমান তদন্ত এবং পরিচালকদের পদ নিয়ে সৃষ্ট আইনগত প্রশ্ন নিষ্পত্তির আগেই এই সভা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা তারা আইনসম্মত নয় বলে মনে করছেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সভা আয়োজনের প্রশাসনিক প্রস্তুতিতে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (সিসি) মো. মইনুল আহসান চৌধুরী এবং কোম্পানি সেক্রেটারি চৌধুরী এহসানুল হক সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, তাদের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে এবং এসব বিষয়ে বিভিন্ন সংস্থায় অভিযোগ দাখিল রয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কোম্পানির বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (সিসি) মো. মইনুল আহসান চৌধুরী ও কোম্পানি সেক্রেটারি চৌধুরী এহসানুল হকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে। News PhotoCard SHARES অর্থ নিউজ বিষয়: