ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডিসহ ৯ কর্মকর্তাকে দুদকের তলব প্রকাশিত: ৭:১৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬ নিজস্ব প্রতিবেদক : বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া, সেই অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলী রেজা ইফতেখারসহ নয় কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চট্টগ্রামভিত্তিক রপ্তানিকারক নাজমুল আবেদীন এবং তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন তিন প্রতিষ্ঠানের নামে ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুদক। ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে অভিযোগের বিভিন্ন দিক যাচাই করতে এই তলব করা হয়েছে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট সংস্থাটির সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২ থেকে ইস্টার্ন ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পৃথক নোটিশ পাঠানো হয়। দুদকের উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিনের নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি দল বিষয়টি অনুসন্ধান করছে। নোটিশ অনুযায়ী, ব্যাংকের চার কর্মকর্তাকে সোমবার ৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে দুদক কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছে। তাঁরা হলেন আগ্রাবাদ শাখার সিনিয়র রিলেশনশিপ ম্যানেজার সঞ্জয় দাস, ইউনিট হেড (অ্যাসেট টিম-২) আহসান জামান চৌধুরী, এরিয়া হেড (করপোরেট ব্যাংকিং) মো. খুরশেদ উল আলম এবং সিনিয়র ম্যানেজার (ক্রেডিট এডমিন) মেহের ফারজানা। প্রধান কার্যালয়ের চার কর্মকর্তাকে ৯ সেপ্টেম্বর হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন অ্যাসোসিয়েট ম্যানেজার মোয়াজ্জেম হোসেন সুমন, হেড অব করপোরেট রিস্ক উসমান রাশেদ মুয়ীন, হেড অব ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট আবুল মাকসুদ এবং ব্যাংকের এমডি ও সিইও আলী রেজা ইফতেখার। এ ছাড়া প্রধান কার্যালয়ের ডিএমডি-করপোরেট ব্যাংকিং মো. ফখরুল আলমকে ৬ সেপ্টেম্বর দুদকে হাজির হতে বলা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত তারিখে তিনি উপস্থিত হননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। দুদকের নোটিশে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সঙ্গে নিয়ে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ হাজির না হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য নেই—এমনটি ধরে নেওয়া হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। দুদক চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-২-এর উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবেই ব্যাংকের কর্মকর্তাদের তলব করা হয়েছে। এর বেশি কিছু জানাতে তিনি রাজি হননি। দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এঅ্যান্ডবি আউটওয়্যার লিমিটেড, নর্ম আউটফিট লিমিটেড ও কোল্ড প্লে স্কুল প্রোডাক্ট লিমিটেডের প্রকৃত সুবিধাভোগী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল আবেদীন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নেওয়া ঋণের অর্থের কোনো অংশ আত্মসাৎ কিংবা বিদেশে পাচার হয়েছে কি না, সেটিও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার সহযোগিতায় জাল নথি ও বিভিন্ন অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়েও তদন্ত করছে দুদক। সব মিলিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ২৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া, আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ যাচাই করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ঋণ অনুমোদন থেকে শুরু করে অর্থ বিতরণ পর্যন্ত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতেই তাঁদের বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, নাজমুল আবেদীনের মালিকানাধীন তিন প্রতিষ্ঠানই চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে পোশাক রপ্তানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এঅ্যান্ডবি আউটওয়্যার লিমিটেড, নর্ম আউটফিট লিমিটেড এবং কোল্ড প্লে স্কুল প্রোডাক্ট লিমিটেড। তিন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নাজমুল আবেদীনের নাম রয়েছে। পাওনাদার ব্যাংকের নথিপত্রে নর্ম আউটফিট লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে নাজমুল আবেদীনের শ্বশুর একেএম জাহিদ হোসেন সিদ্দিকীর নাম উল্লেখ রয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক হিসেবে তাঁর স্ত্রীর নামও রয়েছে। এনআরবিসি ব্যাংকের ঋণ নিয়েও মামলা: নাজমুল আবেদীনের বিরুদ্ধে ব্যাংকঋণ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নর্ম আউটফিট অ্যান্ড একসেসরিজ লিমিটেডের ঋণ ও আমদানি কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলার এজাহার অনুযায়ী, জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে বন্ড সুবিধার আওতায় ২২ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজার ৩৪২ টাকার কাঁচামাল আমদানি করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে ৭ কোটি ১৪ লাখ ১৩ হাজার ১১২ টাকা মানি লন্ডারিং এবং এতে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়। ওই মামলায় নাজমুল আবেদীনের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী সোহেলা আবেদীন ও একেএম জাহিদ হোসেনকেও আসামি করা হয়। মামলায় এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং কাস্টমসের সাবেক কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হয়েছিল। জাল নথি তৈরি ও ব্যবহার, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে করা ওই মামলার পাশাপাশি এবার ইস্টার্ন ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুদক। ফলে নাজমুল আবেদীন ও তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকঋণ, অর্থের ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান আরও বিস্তৃত হচ্ছে। News PhotoCard SHARES অভিযোগ বিষয়: