নিম্নমুখী রপ্তানি ও আমদানির চাপে বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি প্রকাশিত: ২:৩০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৫, ২০২৬ নিজস্ব প্রতিনিধি : সামগ্রিক অর্থনীতি একটা চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বিষয়গুলো আমাদের ভাবিয়ে তুলছে : অধ্যাপক আবু আহমেদ সামনের বাজেট বড় হলে অর্থনীতিতে চাপ আরো বাড়বে। এখানেও সরকারকে সাশ্রয়ী হতে হবে : ড. জাহিদ হোসেন। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ বাড়ছেই। রপ্তানি আয় টানা কয়েক মাস ধরে নিম্নমুখী প্রবণতায় থাকলেও আমদানি ব্যয় একই সময়ে ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায় রয়েছে। ফলে রপ্তানি-আমদানির ব্যবধান দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, যা বাণিজ্য ঘাটতির চাপকে বাড়িয়ে তুলছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এই চাপকে আরো জটিল করে তুলছে। সাম্প্রতিক সূচকগুলো বলছে, পরিস্থিতি শুধু স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ওঠানামা নয়, বরং বৈদেশিক খাতের ভারসাম্যে একটি ধারাবাহিক চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রপ্তানির দুর্বল গতি এবং আমদানির ব্যয়বৃদ্ধি একসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম আট মাসে দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬.৯১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৩.৭১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাত্ এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকারও বেশি। রপ্তানি খাতে দুর্বলতা এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশের পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩ হাজার ৫৩৮ কোটি ৬৫ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ কম। মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও পরবর্তী সাত মাস ধরে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে মার্চ মাসে রপ্তানিতে বড় ধস দেখা গেছে। ঐ মাসে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩৪৮ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ কম। এই পতনের পেছনে মূলত তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের মতো শীর্ষ খাতগুলোর দুর্বল পারফরম্যান্স দায়ী। ছোট ও মাঝারি অনেক রপ্তানি খাতেও একই ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশের মোট আমদানি দাঁড়িয়েছে ৪৬.১৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪৩.৭৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাত্ এক বছরে আমদানি বেড়েছে প্রায় ৫.৬ শতাংশ। একই সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম। জানতে চাইলে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘বর্তমান সংকটটি দেশিও নয়, এটি আন্তর্জাতিক। তবে ব্যবসায়ীদের সুদহার বেশি হওয়াতেও আমদানি-রপ্তানিতে সমস্যা তৈরি করছে। জ্বালানিতে যে সংকট তৈরি হয়েছে এটি আমাদের ভোগাবে। এতে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার কমার শঙ্কা রয়েছে। সামগ্রিক অর্থনীতি একটা চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বিষয়গুলো আমাদের ভাবিয়ে তুলছে।’ বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। এর ফলে বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রপ্তানি প্রত্যাশিত হারে না বাড়লেও আমদানি বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে। তবে এই চাপের মধ্যেও কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২২.৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৮.৪৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাত্ এক বছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘রপ্তানিতে আগে থেকেই নিম্নমুখী একটা অবস্থা ছিল জুলাইয়ের পর থেকেই। মার্চে এসে তা আরো কমেছে। আর জ্বালানি সংকটের ফলে অর্থনীতিতে নতুন করে একটা চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারকে এটি মোকাবিলায় জ্বালানি আমদানিতে বিকল্প রুট দেখতে হবে, যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যের রুটে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যয়ে সাশ্রয়ীও হতে হবে। সরকার ইতিমধ্যেই সেটি করছে। তবে তেলের দাম বাড়ানোর বিকল্প নেই। এটি আরো আগে বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। রপ্তানির চেয়ে উচ্চ মূল্য আমদানি বেশি করতে হচ্ছে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। তিনি বলেন, সামনের বাজেট যদি বড় হয় সেটি অর্থনীতিতে চাপ আরো বাড়িয়ে দেবে। তাই বাজেটেও সরকারকে সাশ্রয়ী হতে হবে। মুদ্রা বিনিময় হারও নমনীয় রাখতে হবে। এটিকে যেন কৃত্রিমভাবে চাপিয়ে না রাখা হয়।’ সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের প্রথম আট দিনেই দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৯৭৫ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। অর্থবছরের শুরু থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭.১৮ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকায় চলতি হিসাবের ঘাটতি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত রয়েছে। ফেব্রুয়ারি শেষে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১.৪৭ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে আর্থিক হিসাবেও উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪.০৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৪৩৫ মিলিয়ন ডলার। মূলত ট্রেড ক্রেডিট বৃদ্ধি এবং রপ্তানির বকেয়া অর্থ দেশে ফিরে আসার কারণেই এই উন্নতি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সব মিলিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আপাতত কিছুটা স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট রিজার্ভ ৩৪.৬৪ বিলিয়ন ডলার, আর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৯.৯৫ বিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞরা জানান, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই না-ও হতে পারে। রপ্তানি খাতে ধারাবাহিক দুর্বলতা এবং আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাণিজ্য ঘাটতির চাপ আরো বাড়বে। এতে ভবিষ্যতে বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রপ্তানি খাতের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, নতুন বাজার অনুসন্ধান, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। অন্যথায় বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে এই চাপ আরো তীব্র হয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। SHARES অর্থনীতি বিষয়: