বাজেটে বড় লক্ষ্য, সামনে কঠিন বাস্তবতা

প্রকাশিত: ৯:৩৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ১১, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : দীর্ঘ ১৯ বছর পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার জাতীয় সংসদে পূর্ণাঙ্গ বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, বিনিয়োগের স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের সংকট ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আসছে এ বাজেট। ফলে এটিকে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা।

প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত

সরকার আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে এডিবি মনে করে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এর জন্য বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফিরিয়ে আনা জরুরি।

সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ থাকলে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে।

মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব আহরণের কঠিন সমীকরণ
সরকার মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে।

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বড় আকারের সরকারি ব্যয় অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ তৈরি করলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। ফলে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কতটা অর্জনযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদেরা।

বাজেটের মাধ্যমে কী বার্তা আসবে

অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন ও সংস্কার কর্মসূচির দিকনির্দেশনাও তুলে ধরবে।

ড. মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, সরকার আর্থিক খাত, করব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি কতটা গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নিতে চায়, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলবে এই বাজেটে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নতুন সরকারের জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়ন কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এবারের বাজেটের মূল প্রশ্ন কত টাকা ব্যয় করা হবে, সেটি নয়; বরং সেই অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা যাবে, সেটিই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী অর্থনৈতিক যাত্রাপথ।

বিএনপি সরকারের সর্বশেষ বাজেট উপস্থাপিত হয়েছিল ২০০৬-০৭ অর্থবছরে। তখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন প্রয়াত এম সাইফুর রহমান। প্রায় দুই দশক পর আবারও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার জাতীয় বাজেট দিতে যাচ্ছে।

এবারের বাজেটের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ ও নিয়ন্ত্রণমুক্তি: ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের যাত্রা’। সরকার বলছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সামনে রেখেই এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো আগামী অর্থবছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি চ্যালেঞ্জ।

ঘাটতি অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগ

প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক উৎস থেকে নিট ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় অংশই আসবে ব্যাংক খাত থেকে। সরকার প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি সংকুচিত হতে পারে।

অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরীর ভাষায়, রাজস্ব আহরণ না বাড়িয়ে বাজেটের আকার বড় করা হলে অর্থনীতি আরও বেশি ঋণনির্ভর হয়ে উঠবে। এতে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

দুর্বল ব্যাংক খাতের ওপর বাড়তি চাপ

ঘাটতি অর্থায়নের পরিকল্পনা এমন সময়ে নেওয়া হচ্ছে, যখন ব্যাংক খাত নিজেই নানা সংকটে রয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ২ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

এ ছাড়া দেশের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৮৫ শতাংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে মাত্র ১০ থেকে ১২টি ব্যাংকে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত সরকারি ঋণ গ্রহণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়াতে পারে। এতে সুদের হার বৃদ্ধি, তারল্য সংকট এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।