৬ কোটি প্রিমিয়ামে ২১ কোটি টাকা ব্যয় শান্তা লাইফের

প্রকাশিত: ৮:৪০ অপরাহ্ণ, জুন ৮, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিনিধি : ব্যবসা শুরুর প্রথম ১৩ মাসে ৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা প্রিমিয়াম আয় করতে ২১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় করেছে শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্স। অনুমোদিত সীমার চেয়ে এ ব্যয় ১ হাজার ৩৯৬ শতাংশ বেশি। এতে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ডে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। একই সময়ে বিভিন্ন খাত থেকে আরও ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধে কোম্পানিটির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কোম্পানিটির ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রিমিয়াম আয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি। এ ছাড়া কমিশন ব্যয়ে নিয়ম লঙ্ঘন ও আর্থিক প্রতিবেদনে গড়মিল তথ্যও পাওয়া গেছে।

শান্তা লাইফ ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করে। ওই বছরের শেষ এক মাসে ৪৪ লাখ টাকা প্রিমিয়াম আয় করতে কোম্পানিটি ব্যয় করে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। পরের বছর ২০২৫ সালে ৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহে ব্যয় হয় আরও ১৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে প্রথম ১৩ মাসে ৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা প্রিমিয়াম আয়ের বিপরীতে কোম্পানিটির মোট ব্যয় দাঁড়ায় ২১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। যা মোট প্রিমিয়াম আয়ের ৩১১ শতাংশ।

এর মধ্যে শুধু বেতন-ভাতা খাতেই ব্যয় হয়েছে মোট প্রিমিয়ামের ১৬১ শতাংশ। অন্য প্রশাসনিক খাতে ব্যয় হয়েছে আরও ১৪১ শতাংশ।

লাইফ বীমা খাতে সাধারণভাবে ধারণা রয়েছে, ব্যবসার শুরুর দিকে অফিস স্থাপন ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় কিছুটা বেশি হয়। তবে বীমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতেই অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ নেই। অবকাঠামোগত ব্যয়েরও স্বাভাবিক সীমা থাকতে হবে।

তাদের মতে, ব্যবসা শুরু না হতেই অফিস ভাড়া ও অবকাঠামো খাতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের প্রিমিয়ামের ওপরই চাপ তৈরি করে।

শান্তা লাইফের চতুর্থ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে ৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা প্রিমিয়াম আয়ের বিপরীতে মোট ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। অথচ ৩১ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে একই ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।

অর্থাৎ দুই প্রতিবেদনের মধ্যে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে পার্থক্য রয়েছে ২ কোটি ২৪ লাখ টাকা বা প্রায় ১৪ শতাংশ।

অন্যদিকে কোম্পানিটির নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদনে একই সময়ে ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দাখিল করা তিন ধরনের প্রতিবেদনে একই সময়ের ব্যয় নিয়ে তিন ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।

আইন অনুযায়ী নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহে এজেন্ট কমিশন বাবদ সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করা যায়। কিন্তু শান্তা লাইফ ২০২৫ সালে এ খাতে ১৪ দশমিক ৫২ শতাংশ কমিশন দিয়েছে।

কোম্পানিটির ৩১ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২ লাখ ১০ হাজার টাকা নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহে এজেন্ট কমিশন বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার টাকা।

যা আইডিআরএর ‘সার্কুলার নং-৩(খ)/২০১২’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ২০১২ সালের ১৫ মার্চ এ সার্কুলার জারি করা হয়।

লাইফ বীমা কোম্পানির মূল ভিত্তি হচ্ছে ‘লাইফ ফান্ড’। গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধের জন্য এ তহবিল গঠন করা হয়। কিন্তু ব্যবসার শুরুতেই অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয়ের কারণে শান্তা লাইফ পর্যাপ্ত লাইফ ফান্ড গঠন করতে পারেনি।

২০২৪ সালে ৪৪ লাখ টাকা প্রিমিয়াম আয় করলেও কোম্পানিটির লাইফ ফান্ডে ঘাটতি ছিল ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় মাইনাস ১৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকায়।

এ ছাড়া বিভিন্ন খাত থেকে আরও ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে কোম্পানিটি। ফলে লাইফ ফান্ডে ঘাটতি ও ঋণের চাপ মিলিয়ে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রধান কার্যালয়ের বাইরে শান্তা লাইফের দুটি শাখা অফিস রয়েছে। এসব অফিসে কর্মরত আছেন ৬১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

কোম্পানিটির মাঠকর্মীর সংখ্যা ৩২৪ জন। এর মধ্যে ফিল্ড অ্যাসোসিয়েট (এফএ) ২৫৯ জন এবং ব্রাঞ্চ ম্যানেজার (বিএম) ৬৫ জন। এ ছাড়া বিএমের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আরও ৩৮ জন কর্মরত আছেন।

শান্তা লাইফের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) ও কোম্পানি সেক্রেটারি মাজেদুর রশীদ চৌধুরী বলেন, যেকোনো লাইফ বীমা কোম্পানির প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবসার পরিধি সীমিত থাকায় পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়া স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, মূল বিষয় হলো এই ব্যয় কোম্পানির টেকসই কাঠামোগত উন্নয়নে হচ্ছে কি না, নাকি আর্থিক অব্যবস্থাপনার কারণে বাড়ছে।

বর্তমান ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, দক্ষ জনবল নিয়োগ ও একটি মানসম্মত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতেই প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি হচ্ছে। তবে আগামী দুই বছরের মধ্যে ব্যয় অনুমোদিত সীমার মধ্যে চলে আসবে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে কোম্পানির লাইফ ফান্ড ইতিবাচক অবস্থানে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আগামী তিন বছরের মধ্যে মুনাফায় ফেরা ও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মুনাফায় ফেরার সম্ভাবনা কম। এজন্য পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সময় বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আবেদন করতে হতে পারে।

তবে নবায়ন প্রিমিয়ামে ১৪ দশমিক ৫২ শতাংশ কমিশন প্রদানের বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।